Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণের আর্জি

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (হু) হিসেবে, ৭ কোটি ৭০ লক্ষ ভারতবাসী টাইপ টু ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগে আক্রান্ত। আরও আড়াই কোটি লোকের সামনে ‘নোটিস’ ঝুলে রয়েছে, ‘এখনই সাবধান হও, না-হলে তোমাদেরকেও মধুমেহ রোগের ঝামেলা পোহাতে হবে!’ মানে, তারা ‘প্রি-ডায়াবেটিক’ বা মধুমেহ আক্রান্ত হওয়ার পূর্বাবস্থায় রয়েছে।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণের আর্জি
  • ১৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (হু) হিসেবে, ৭ কোটি ৭০ লক্ষ ভারতবাসী টাইপ টু ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগে আক্রান্ত। আরও আড়াই কোটি লোকের সামনে ‘নোটিস’ ঝুলে রয়েছে, ‘এখনই সাবধান হও, না-হলে তোমাদেরকেও মধুমেহ রোগের ঝামেলা পোহাতে হবে!’ মানে, তারা ‘প্রি-ডায়াবেটিক’ বা মধুমেহ আক্রান্ত হওয়ার পূর্বাবস্থায় রয়েছে। দেশের ৫০ শতাংশ মানুষ জানেই না, তাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ ঠিক কতটা। পাশাপাশি একাধিক মেডিক্যাল জার্নালের রিপোর্টের হুঁশিয়ারি, আগামী ২৫ বছরের মধ্যে ভারতের ৪৫ কোটি মানুষ ওবেসিটির শিকার হবে। স্থূলতার মাপকাঠিতে আমাদের সামনে থাকবে শুধুমাত্র আমেরিকা। এই মুহূর্তে ভারতে প্রতি পাঁচজনের একজন মাত্রাতিরিক্ত ওজনের কারণে শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। ২০৫০ সালে সংখ্যাটা দাঁড়াবে প্রতি তিনজনে একজন! এই অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধির একটি বড় কারণ অসাবধানী খাদ্যাভ্যাস। ভারতবাসীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান হৃদরোগের প্রবণতাও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে, এদেশে প্রতিবছর অন্তত ৭ লক্ষ নরনারী হৃদরোগে (সাডেন কার্ডিয়াক অ্যাটাক) আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই মারাত্মক সমস্যারও অন্যতম কারণ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস। 

Advertisement

মানুষ বেঁচে থাকতে চায়। তারা চায় দীর্ঘায়ু। দীর্ঘায়ু নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগও কেউ কেউ নানাভাবে পেতে পারে। কিন্তু সুস্থভাবে, আনন্দে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার সৌভাগ্য সকলের হয় না। কেবল শারীরিক সুস্থতাই যথেষ্ট নয়, সঙ্গে জরুরি মানসিক সুস্থতাও। এমন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষ যদি ওইসঙ্গে দীর্ঘজীবনও পেয়ে যায়, তবে মানুষ জন্ম সার্থক হতে পারে। বহু ভালো কাজ করে যেতে পারে এমন মানুষজন। তাদের অনেক স্বপ্ন পূরণ হতে পারে। আর এখানেই দুর্ভাগ্য, অসংখ্য মানুষ ঊর্বর মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য গুণাবলি পাওয়া সত্ত্বেও জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়। কারণ অসুস্থতা এবং স্বল্পায়ু তাদের লক্ষ্যের সামনে সারাক্ষণ ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাই প্রতিটি মানুষকে সুস্থভাবে বাঁচার চেষ্টা করা দরকার। এজন্য সুন্দর পরিবেশে বসবাস এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ জরুরি। দ্বিতীয় বিষয়টিই গোলমেলে। খাবারদাবার সুস্বাদু মানেই কিন্তু স্বাস্থ্যকর নয়। বরং বহু ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টোই হয়ে থাকে। বেশিরভাগ মুখরোচক খাবারই বাস্তবে ‘স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর’ বা ‘অস্বাস্থ্যকর’ বলে বিবেচিত হয়। মানুষ বাঁচার জন্য খায়। কিন্তু বহু ভোজনরসিক মানুষের জীবনদর্শন দেখে মনে হয় যে, তারা খাবার জন্যই বাঁচে। তারা শুধু মুখরোচক এবং বেশি পরিমাণে খাবারই খায় না, ওইসঙ্গে নানাপ্রকার নেশারও দাস। ধূমপান থেকে সুরাপানেও আসক্ত তারা। কল্যাণকামী প্রতিটি রাষ্ট্র চেষ্টা করে নেশার ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করে দিতে। তামাকজাত নেশার বস্তু থেকে কী কী দুরারোগ্য রোগ হতে পারে, প্রশাসনের তরফে সেই ব্যাপারে নাগরিককে সচেতন করে দেওয়া হয়। সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাশাপাশি কিছু হোর্ডিং, পোস্টার প্রভৃতি দেওয়া হয় বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে। বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় প্রেক্ষাগৃহে, খবরের কাগজে, টেলিভিশনে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায়। দীর্ঘদিন জানানো হতো শুধু ‘ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর’। এখন তার জায়গায় ছবিসহ জানিয়ে দেওয়া ধূমপান, খৈনি, গুটখার মতো তামাকজাত নেশার বস্তুগ্রহণে ক্যান্সারও হতে পারে। এসব ক্যান্সারের কারণ এবং ‘স্মোকিং কিলস’—প্রাণনাশ পর্যন্ত করতে পারে। মদ্যপানের ক্ষতিকারক দিকও তুলে ধরা হয় সরকারি প্রচারে।
সরকার এবার সরাসরি বলবে খাবারেও রাশ টানার কথা। এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক। সিগারেটের মতো সতর্কীকরণ আসতে চলেছে এবার জিলিপি-শিঙাড়ার মতো মুখরোচক ভারতীয় খাবারেও! রীতিমতো নির্দেশিকাসহ স্বাস্থ্যমন্ত্রক জানিয়েছে, এবার থেকে নাগপুর এইমস-সমেত কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত সংস্থাতেই নিত্যদিনের ‘স্ন্যাক্স’ জাতীয় খাবার নিয়ে সতর্কবার্তা সংবলিত বোর্ড ঝোলাতে হবে। তাতে স্পষ্ট লেখা থাকবে, কোন খাবারে ঠিক কতটা চিনি বা তেল রয়েছে। শিঙাড়া, জিলিপি, বড়াপাও, লাড্ডু, কোল্ড ড্রিঙ্ক, জ্যাম-জুসের মতো সব খাবারই থাকবে এই তালিকায়। এই প্রচার সংশ্লিষ্ট খাবারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সকলকে সচেতন করবে। ফলে স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি জনসাধারণের ঝোঁক বাড়বে বলে মনে করছে স্বাস্থ্যমন্ত্রক। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাকজাত দ্রব্যের মতোই এই মুহূর্তে অত্যধিক তেল ও চিনিযুক্ত খাবার অত্যন্ত বিপজ্জনক। এসব থেকে একদিকে যেমন মধুমেহ বাড়ছে, তেমনই দেখা দিচ্ছে হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাও। নিঃশব্দে লাগামছাড়া হচ্ছে স্থূলত্ব (ওবেসিটি)। এই মুহূর্তে পৃথিবীর ‘মধুমেহ রাজধানী’র নাম তো ভারত। তাই নাগপুর এইমস দিয়েই শুরু হচ্ছে এই প্রচার। তবে আপাতত শুধু সতর্কতাই, কোনোরকম নিষেধাজ্ঞা জারি হচ্ছে না। নিঃসন্দেহে সাধু উদ্যোগ। আপন ভালো পাগলেও বোঝে। এবার সতর্ক হওয়ার দায় অনেকটাই নাগরিকের।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ