Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিস্তীর্ণ দু’পারের অসংখ্য মানুষের প্রতিনিধি

সংগীতের প্রতি অনুরাগী সকলের জন্য আজ একটি বিশেষ দিন। দিনটি আমার অসমের বোন এবং ভাইদের জন্য আরও বিশেষ।

বিস্তীর্ণ দু’পারের অসংখ্য মানুষের প্রতিনিধি
  • ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নরেন্দ্র মোদি: সংগীতের প্রতি অনুরাগী সকলের জন্য আজ একটি বিশেষ দিন। দিনটি আমার অসমের বোন এবং ভাইদের জন্য আরও বিশেষ। সর্বোপরি, আজ ভারতের সর্বকালের সবচেয়ে অসাধারণ কণ্ঠস্বরের অন্যতম ডঃ ভূপেন হাজারিকার জন্মবার্ষিকী। আপনারা সকলেই জানেন যে, এবছর তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের সূচনা হচ্ছে। ভারতীয় শিল্পের বিকাশে এবং জনসচেতনতায় তাঁর অসামান্য অবদান ফিরে দেখার এটি এক উপলক্ষ মাত্র।

Advertisement

ভূপেনদা আমাদের যা দিয়েছেন তা সংগীতের বাইরেও বহুদূর বিস্তৃত। তাঁর কাজ সুরের পাশাপাশি আবেগকেও বিশেষভাবে প্রকাশ করে। কেবল একটি কণ্ঠস্বরই নয়, তিনি ছিলেন মানুষের হৃদস্পন্দন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর গান শুনে বড় হয়েছে।  গানের প্রতিটি কথাতেই দয়া,  সামাজিক ন্যায়বিচার, ঐক্য এবং গভীর আত্মিক যোগাযোগ ধ্বনিত হয়।
অসম থেকে এমন এক কণ্ঠস্বর উঠে এসেছে যা সীমানা এবং সংস্কৃতির বন্ধন পেরিয়ে মানবতার চেতনাকে সঙ্গে নিয়ে এক কালজয়ী নদীর মতো প্রবাহিত হয়েছে। ভূপেনদা বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন, সমাজের সকল স্তরের মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছেন, কিন্তু তাঁর শিকড় অসমের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিল। অসমের সমৃদ্ধ কথকতার ঐতিহ্য,  লোকসুর এবং জনগণের গল্প বলার অভ্যাস তাঁর শৈশবকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতাগুলিই গড়ে তুলেছিল তাঁর শৈল্পিক শব্দভাণ্ডারের ভিত্তি। তিনি সবসময়ই অসমের নিজস্ব পরিচয় এবং সেখানকার জনগণের মুল্যবোধ বয়ে চলেছেন।
খুব অল্প বয়সেই ভূপেনদার মধ্যে প্রতিভার বিকাশ ঘটে। মাত্র পাঁচবছর বয়সে তিনি এক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনের পর অসমীয়া সাহিত্যের পথিকৃৎ লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার নজরে আসেন। কিশোর বয়সে তিনি তাঁর প্রথম গান রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু সংগীত ছিল তার ব্যক্তিত্বের একটি অংশ মাত্র। ভূপেনদা ছিলেন একজন বুদ্ধিজীবী...কৌতূহলী, স্পষ্টবাদী ব্যক্তিত্ব। বিশ্বকে জানার, বোঝার এক ব্যাপক আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর। জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা এবং বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার মতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলেন এবং তাঁর জানার ইচ্ছাকে আরও বাড়িয়ে তোলেন তাঁরা। শেখার এই আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে কটন কলেজ ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে সাফল্য অর্জনে সহায়তা করেছিল। সেই সাফল্য পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও নিয়ে গিয়েছিল তাঁকে।  সেখানে তিনি সেই সময়ের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ এবং সংগীতজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন। কিংবদন্তি শিল্পী এবং নাগরিক অধিকার বিষয়ক নেতা পল রবসনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। রবসনের ‘‘ওল’ ম্যান রিভার’’ গানটি ভূপেনদা’র অন্যতম সৃষ্টি ‘‘বিস্তীর্ণ দু’পারের অসংখ্য মানুষের’’—গানটির অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। বহু প্রশংসিত প্রাক্তন আমেরিকান ফার্স্ট লেডি, এলিনর রুজভেল্ট, ভারতীয় লোকসংগীত পরিবেশনার জন্য তাঁকে স্বর্ণপদক প্রদান করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার সুযোগ ভূপেনদার ছিল, কিন্তু তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং নিজেকে নিমগ্ন করেন সংগীতে। রেডিয়ো থেকে শুরু করে থিয়েটার, চলচ্চিত্র থেকে শিক্ষামূলক তথ্যচিত্র, এই প্রতিটি মাধ্যমেই তিনি পারদর্শী ছিলেন। যেখানেই যেতেন, তরুণ প্রতিভাদের সমর্থন করার উপর জোর দিতেন তিনি। তাঁর রচনায় গীতিমূলক ভাবের মিশ্রণ ছিল এবং দরিদ্রদের জন্য ন্যায়বিচার, গ্রামীণ উন্নয়ন, সাধারণ নাগরিকদের শক্তি প্রভৃতি সামাজিক বার্তাও দেওয়া হয়েছিল। তাঁর সংগীতের মাধ্যমে তিনি নৌকার মাঝি, চা-বাগানের শ্রমিক, মহিলা, কৃষকের মতো অনেকের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে কণ্ঠ দান করেন। ভূপেনদার রচনাগুলি স্মৃতিমেদুর করে তোলার পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গির শক্তিশালী দর্পণ হয়ে ওঠে। অনেক মানুষ, বিশেষ করে তাঁর মতো সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ, তাঁর সংগীত থেকে আশা-আকাঙ্ক্ষা ও শক্তি অর্জন করেছিলেন।
ভূপেন হাজারিকার জীবনযাত্রায় ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’-এর চেতনার শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর রচনাগুলি ভাষাগত ও আঞ্চলিক সীমানা অতিক্রম করে সারা দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। তিনি অসমিয়া, বাংলা এবং হিন্দি ভাষায় চলচ্চিত্রের জন্য সুরারোপ করেছেন। তিনি অসমকে ভারতের অন্যান্য অংশের কাছে তুলে ধরেছেন এবং সেখানকার সংগীতকে পৌঁছে দিয়েছেন সকলের কাছে। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, তিনি নিজের রাজ্যে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী অহমিয়া জনগণের জন্য আধুনিক অসমের সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে সাহায্য করেছেন। 
ভূপেনদা, যদিও প্রকৃত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, তবুও জনসেবার জগতের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৭ সালে অসমের নাওবৌচা আসন থেকে তিনি নির্দল বিধায়ক নির্বাচিত হন। এর থেকেই প্রমাণিত হয় যে তাঁর ব্যক্তিত্ব জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের মধ্যে কতটা গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। যদিও তিনি কখনও একজন পেশাদার রাজনীতিবিদ ছিলেন না, অন্যদের সেবা করার জন্য তাঁর ইচ্ছে ছিল অত্যন্ত বেশি। 
ভারত সরকার এবং দেশের জনগণ বছরের পর বছর ধরে তাঁর বিশাল অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে-সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৯ সালে, আমাদের আমলে তাঁকে ভারতরত্ন প্রদান করা আমার জন্য এবং এনডিএ সরকারের জন্য একটি সম্মানের বিষয় ছিল। সমগ্র বিশ্বের মানুষ, বিশেষ করে অসম এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনগণ, এই সম্মানে আনন্দ উদযাপন করেছেন। সংগীত যখন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তা সমস্ত বাধা অতিক্রম করতে পারে—ভূপেনদার অন্তস্তল জুড়ে থাকা এই চেতনার উদযাপন ছিল এই সম্মান। একটি গান মানুষের স্বপ্নকে বহন করতে পারে এবং বিশ্ববাসীর হৃদয়ে আলোড়ন তুলতে পারে। 
২০১১ সালে ভূপেনদা মারা যাওয়ার সময়ের কথা আমার মনে আছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ টেলিভিশনে তাঁর শেষকৃত্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সেইসময় প্রত্যেকের চোখ ভিজে গিয়েছিল। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের মতো, মৃত্যুতেও তিনি মানুষকে একত্রিত করেছিলেন। তাই তাঁর সংগীতের রূপক এবং স্মৃতির জীবনরেখা ব্রহ্মপুত্রের উপকূলে জালুকবাড়ি পাহাড়ে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা ছিল যথার্থ সিদ্ধান্ত। এটা আনন্দের যে অসম সরকার ভূপেন হাজারিকা সাংস্কৃতিক ট্রাস্টের কাজটিকে সমর্থন করেছে। এই ট্রাস্ট তরুণদের মধ্যে তাঁর জীবনযাত্রাকে জনপ্রিয় করার জন্য কাজ করছে। 
ভূপেন হাজারিকার জীবন আমাদের সহানুভূতির ক্ষমতা বোঝানোর পাশাপাশি মানুষের কথা শোনার এবং শিকড়কে আঁকড়ে ধরে রাখার শিক্ষা দেয়। তাঁর গান এখনও ছোট-বড় সকলেই গায়। তাঁর সংগীত আমাদের সহানুভূতিশীল এবং সাহসী হতে শেখায়। এটি আমাদের নদী, আমাদের শ্রমিক, আমাদের চা-শ্রমিক, আমাদের নারীশক্তি এবং আমাদের যুবশক্তিকে মনে করার কথা বলে। এটি আমাদের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যে বিশ্বাস করতে উৎসাহিত করে।
ভারত ভূপেন হাজারিকাকে পেয়ে ধন্য। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীর সূচনা উদযাপনের সঙ্গে সঙ্গেই আসুন এই মহান ব্যক্তিত্বের বার্তা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করি আমরা। এটি আমাদেরকে সংগীত, শিল্প ও সংস্কৃতিকে সমর্থন জানাতে, তরুণ প্রতিভাকে উৎসাহিত করতে এবং ভারতকে সৃজনশীলতা ও শৈল্পিক উৎকর্ষের এক লালনক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করুক।
এটা উল্লেখযোগ্য যে, ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো প্রকল্প, ঢোলা আর সাদিয়ার মধ্যে যোগাযোগকারী সেতুটি ভূপেন হাজারিকার নামাঙ্কিত, ঠিক যেমনভাবে তাঁর গান বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মনের যোগসূত্র হয়ে উঠেছিল। এই সুন্দর সেতুটি বিভিন্ন স্থান ও অসংখ্য মানুষকে যুক্ত করেছে।
 লেখক ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ