Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চেনা ছবির পুনরাবৃত্তি

ছবিটা বড্ড চেনা। যে কোনও বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর যেমন হয়ে থাকে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া সারি সারি মৃতদেহের অস্থায়ী ঠিকানা হয়েছে হাসপাতালের মর্গ। সেই মৃতদের মধ্যে থেকে প্রিয়জনের নিথর দেহ ফিরে পেতে আপনজনদের আকুল অপেক্ষা।

চেনা ছবির পুনরাবৃত্তি
  • ১৫ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ছবিটা বড্ড চেনা। যে কোনও বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর যেমন হয়ে থাকে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া সারি সারি মৃতদেহের অস্থায়ী ঠিকানা হয়েছে হাসপাতালের মর্গ। সেই মৃতদের মধ্যে থেকে প্রিয়জনের নিথর দেহ ফিরে পেতে আপনজনদের আকুল অপেক্ষা। আমেদাবাদের বিমান দুর্ঘটনায় যেহেতু ভয়াল আগুনে ঝলসে দলা পাকিয়ে গিয়েছে দেহগুলি, তাই সংগত কারণেই পরিবারের সঙ্গে ডিএনএ মিলিয়ে মৃতদেহ আত্মীয়ের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গুজরাত সরকার। কাজটি যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। কারণ মৃতদেহ বলে যা দেখা যাচ্ছে, তা আসলে অনেকক্ষেত্রে দেহের অংশবিশেষ। তবু দ্রুত কাজ শেষ করতে হাসপাতালের ডাক্তার থেকে কর্মীরা দিন-রাত এক করে পরিশ্রম করছেন। এই বিরল দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও একটা ছবি প্রচার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেটাও বড্ড চেনা। অন্তত গত এক দশক ধরে। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানের একটা অংশ মেডিক্যাল পড়ুয়াদের হস্টেলের ছাদ ফুঁড়ে ঝুলছে। তার নীচে দাঁড়িয়ে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সম্ভবত ফটোগ্রাফার মাটিতে শুয়ে পড়ে মোদির পিছন থেকে ছবিটি তুলেছেন। শুক্রবার নিজের রাজ্যের ওই দুর্ঘটনাস্থল, হাসপাতাল সহ কয়েকটি জায়গা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এই ছবিতেই শুধু তিনি আর বিমানের ভাঙা অংশ যেভাবে ‘ছবি’ হিসাবে দেখা গিয়েছে তা চিত্র সাংবাদিকের মুন্সিয়ানার দাবি রাখে। ভাইরাল হয়ে যাওয়া ওই ছবি দেখে তীব্র কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিরোধীরা। এর আগে বৃহস্পতিবার দেশের বিমানমন্ত্রীকে দেখা গিয়েছে, দুর্ঘটনাস্থলে নিজের পরিদর্শনের ভিডিও সম্পাদনা করে, তার সঙ্গে মিউজিক জুড়ে নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরেছেন! এমনটা দেখে কংগ্রেস বলেছে, দেশের দুর্ভাগ্য যে ধ্বংসের ইমারতের সামনে দাঁড়িয়েও এমন ফটো শ্যুট চলে! তৃণমূল বলেছে, প্রধানমন্ত্রী মোদির অন্তত একবার ‘ভান’ করে হলেও লজ্জা পাওয়া উচিত। ‘লজ্জা’ অবশ্য রেলমন্ত্রীও রেল দুর্ঘটনার পর পাননি। অতীতে দেখা গিয়েছে, দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি দিব্যি রিলস বানালেন! তা ছড়িয়েও পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। প্রধানমন্ত্রী লজ্জা পাবেন, এমনটাও হওয়ার নয়।

Advertisement

খবরে প্রকাশ, এই বিমান দুর্ঘটনার পর একটি ‘ব্ল্যাক বক্স’ উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ভয়েস রেকর্ডার। এনএসজি-র হাতে থাকা এই মোক্ষম দুই ‘অস্ত্র’ থেকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে আশা দেশবাসীর। কিন্তু কপালের বলিরেখা দেখে গণনা করার মতোই ইতিমধ্যেই অসামরিক বিমান চলাচলের নিয়ামক সংস্থা ডিজিসিএ দুর্ঘটনার পিছনে পাখির আঘাতে ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার তত্ত্ব বাজারে এনেছে। আর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, এটা একটা দুর্ঘটনা। আর দুর্ঘটনা রোখা যায় না। বিরোধীরা তাই প্রশ্ন তুলেছে, তদন্ত হওয়ার আগেই এটা ‘দুর্ঘটনা’ বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি আসলে সব দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন? দুর্ঘটনা আটকানো না গেলে বিমানমন্ত্রক রেখে লাভ কী? তবে কি এবার থেকে সব বিপর্যয়ের দায় ‘ভাগ্যের উপর’ ছেড়ে দিতে হবে? তদন্তের আগেই একে ‘দুর্ঘটনা’ বলে দেগে দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছু ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন না তো? এমন প্রশ্ন অনেকেরই।
রেল কিংবা বিমান— যে কোনও বড় মাপের দুর্ঘটনার পরই দেখা যায় কর্তারা নড়েচড়ে বসেন। খবরে প্রকাশ, দুর্ঘটনাগ্রস্ত ড্রিমলাইনার বিমানটি প্যারিস থেকে দিল্লি হয়ে আমেদাবাদ পৌঁছেছিল। সেখান থেকে তার গন্তব্য ছিল লন্ডন। প্রশ্ন উঠেছে, আমেদাবাদ থেকে ‘টেক অফ’ করার আগে দীর্ঘ যাত্রাপথের এই বিমানের খুঁটিনাটি সবকিছু পরীক্ষা করা হয়েছিল তো? আধুনিক ও উন্নতমানের ড্রিমলাইনার বিমানটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের নানা অভিযোগ ছিল। সেসব অভাব অভিযোগ, অসুবিধার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের চোখ এড়িয়ে গিয়েছে, তা হতে পারে না। কিন্তু এই দুর্ঘটনার পর ড্রিমলাইনারের উড়ান বন্ধ করে দেওয়া না হলেও এখন থেকে সবকিছু খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে ডিজিসিএ। রেলের ক্ষেত্রেও ছবিটা একই। গত কয়েক বছরে যে ক’টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার প্রায় সব ক’টিতেই তদন্তে ‘প্রযুক্তিগত’ ত্রুটির কথা বলা হয়েছে। রেলকর্তারা এসব জেনেও না জানার ভান করেছিলেন। এখন শোনা যাচ্ছে, বিমান দুর্ঘটনা নাকি তাঁদের চোখ খুলে দিয়েছে। এই ঘটনা থেকে তাঁরা শিক্ষা নিচ্ছেন। তাঁরা ঠিক করেছেন, দেশের সমস্ত প্রিমিয়ার এক্সপ্রেস ও দূরপাল্লার মেল ট্রেন, এক্সপ্রেসের প্রযুক্তিগত দিক খতিয়ে দেখা হবে। সেখানে পরীক্ষার পর ‘ফিট সার্টিফিকেট’ মিললে তবেই ট্র্যাকে গড়াবে সেই ট্রেনের চাকা। কথায় আছে, ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’। অনেক দেরিতে হলেও যাত্রী সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে যদি দেশের সব বিমান ও রেলকে ফিট সার্টিফিকেট নিয়ে তবেই যাত্রা শুরু করার সবুজ সঙ্কেত দেওয়ার নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা হয়, তাহলে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। তবু আফশোস থেকে যাচ্ছে এই ভেবে যে, কর্তাদের ঘুম ভাঙাতে বহু প্রাণকে বলি হতে হল!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ