পূজ্যপাদ শ্রীমৎ স্বামী তথাগতানন্দজী মহারাজের পুণ্যজীবন আজও আমাদের প্রেরণা দেয়। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবধারার ইতিহাসে পূজ্যপাদ মহারাজ, তাঁর অপূর্ব ভাগবত জীবন, অসাধারণ পাণ্ডিত্য এবং ব্যবহারিক জ্ঞান নিয়ে, তাঁর সঙ্গে যাঁরা পরিচিত ছিলেন তাঁদের কাছে এবং যাঁদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ পরিচয় হয়নি, তাঁদের কাছেও এক অনুপ্রেরণার উৎসরূপে রয়েছেন। যেকোনো স্মৃতিচারণার ক্ষেত্রে সমস্যা এই যে সেক্ষেত্রে যাঁর উদ্দেশ্যে স্মৃতিচারণা করা হয়, অনেক সময় স্মৃতিচর্চাটাই সেই উদ্দিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের চেয়ে বেশী সামনে এসে পড়ে। সুতরাং স্মৃতিচারণায় একথা খেয়াল রাখার দরকার আছে যে – যাঁর উদ্দেশ্যে স্মৃতিচারণা করা হচ্ছে, তিনি যেন কোনো ভাবেই আড়ালে না চলে যান।
পূজ্যপাদ স্বামী তথাগতানন্দজীর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের সুযোগ যেদিন হয়েছিল, সেদিনটা আজ স্মৃতির আবছা জগতে চলে গেছে। পরবর্তীকালে মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ পর্বে পূজ্যপাদ মহারাজজীর পক্ষেও তাই প্রথমদিককার সেই মজার পরিচয়ের ঘটনা মনে রাখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু সেই পরিচিতি পর্বের মুহূর্তগুলিতে আরও যাঁরা সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকেই পুরো ঘটনা, পূর্ণ তথ্য কাছে আছে; সেই মজার ঘটনা না বললে, এই স্মৃতিচর্চার অনেকটাই বাদ পড়ে যাবে।
বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের অধীনে পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তখনও প্রবেশের সুযোগ হয়নি। সেই সময় পূজ্যপাদ মহারাজজী ওই আশ্রমের সম্পাদক। অন্য আরেকজন সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তেন। তাঁর সঙ্গে প্রতিদিন যাওয়া হ’ত। পড়ার জন্যে নয়, কেবল শৈশবের আগ্রহে ওই সকালের প্রার্থনাটি শোনার জন্য। এরকমই একদিন দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ করে খেয়াল পড়ল — কে একজন তাঁর বিরাট শক্তিশালী একটি হাত দিয়ে ঘাড়টিকে চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করছেন — ‘কী ব্যাপার? এখানে দাঁড়িয়ে কেন?’ ওইরকম দৃঢ়, উদাত্ত কণ্ঠস্বরের সামনাসামনি একটি নাবালকের যা অবস্থা হওয়ার কথা তাই হয়েছিল। তিনি অবশ্য উত্তরের অপেক্ষা না করে, প্রায় ঘাড় ধরে সম্পূর্ণ শরীরটাকে তুলে নিয়ে চললেন সামনের দিকে, যেখানে সকলে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছে সমবেতভাবে; বিদ্যালয়ের সূচনার সময়ে। তারপরে শোনা হয়েছিল বা জানা গেছে এই তথ্য যে প্রতিদিন তিনি খোঁজ করতেন; যদি কোনোদিন না যাওয়া হ’ত তো তিনি খোঁজ করতেন—ওই ছেলেটা এসেছে কিনা এবং প্রতিদিনই Prayer’এর পরে জুটতো কিছু না কিছু খাবার। যাইহোক, পূজ্যপাদ মহারাজ দীর্ঘদিন ওই আশ্রমের সম্পাদক ছিলেন না, সংঘের নির্দেশে কর্মান্তরে তাঁকে যেতে হয়।
রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির প্রকাশিত ‘স্মৃতিকথায় তথাগতানন্দ’ থেকে