Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বস্তি, অভিনন্দন, স্বাগত

যাঁদের পৃথিবী ‘খিড়কি থেকে সিংদুয়ার’ পর্যন্তই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল একসময়, তেমনই একজন চলে গিয়েছিলেন এই পৃথিবীর বাইরে। তবে অবশ্যই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে নয়।

স্বস্তি, অভিনন্দন, স্বাগত
  • ২১ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

যাঁদের পৃথিবী ‘খিড়কি থেকে সিংদুয়ার’ পর্যন্তই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল একসময়, তেমনই একজন চলে গিয়েছিলেন এই পৃথিবীর বাইরে। তবে অবশ্যই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে নয়। তাই তিনি ফিরেও এলেন মাটির পৃথিবীতে—পৃথিবীটাকে চারদিক থেকে ৪,৫৭৭ বার প্রদক্ষিণ করে। তাতে তিনি অতিক্রম করেছেন মোট সাড়ে ১৯ কোটি কিমি! নিখাদ বাস্তবও যে কখনও কখনও রূপকথার অধিক, এই ঘটনা তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। টানা ২৮৬ দিনের এক আশ্চর্য উড়ান শেষে নিরাপদেই মহাকাশ থেকে ফিরে এসেছেন ভারত বংশোদ্ভব ধরিত্রীকন্যা সুনীতা উইলিয়ামস। তখন ভারতীয় সময় বুধবার ভোর ৩টে ২৭। তবে যাত্রাকালে তাঁদের ফেরার দিন নির্দিষ্ট ছিল অনেক আগেই। গতবছর ৫ জুন আটদিনের জন্য স্পেস স্টেশনে পাড়ি দিয়েছিলেন সুনীতা এবং তাঁর সহযাত্রী বুচ। তারপর মহাকাশযানে ত্রুটি, প্রযুক্তিগত সমস্যা এবং রাজনৈতিক দড়ি টানাটানি কত কী যে হয়েছে! মাত্র আটদিনের সফর প্রলম্বিত হয় ন’মাসে। সারা পৃথিবী, বিশেষ করে আমেরিকা এবং ভারতের উৎকণ্ঠা ছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ তাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং সুনীতা ভারত বংশোদ্ভব এক কন্যা। বাড়তি চিন্তা ছিল তাঁদের বয়সের ভার নিয়েও। তাঁদের সঙ্গে মহাকাশ গবেষণা সংস্থার সর্বক্ষণের যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ ছিল। তারা সবসময় সাহস জুগিয়ে গিয়েছে। তবে আমাদের সকলের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী ছিলেন সুনীতারা। অবশেষে বুধবার সকলের যাবতীয় উৎকণ্ঠা দূর করে তাঁরা নিরাপদেই ফিরে এসেছেন। এই যাত্রায় ফিরেছেন আরও দুই মহাকাশচারী নাসার নিক হেগ এবং রাশিয়ার রসকসমসের আলেকজান্দর গরবুনভ। 

Advertisement

ভারতের ঘড়িতে তখন বুধবার ভোররাত। আমেরিকায় বিকেল। তালাহাসি উপকূলে মেক্সিকো উপসাগরে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন উদ্ধারকারীরা। নাসার সরাসরি সম্প্রচারে শোনা যাচ্ছিল নেপথ্য ভাষণ, ‘শান্ত, কাচের মতো সমুদ্র।’ ফ্লোরিডার পরিষ্কার নীল আকাশে তখন বিন্দুর মতো উঁকি মেরেছে এলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের মহাকাশযানটি। ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে সেটি নেমে আসছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে একে একে খুলে গেল ছ’টি সাদা-লাল প্যারাসুট। ভাসতে ভাসতে উপসাগরের বুকে আলতো করে নেমে এল ড্রাগন ক্যাপসুল। সর্বাধিক সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল এবং তার সবগুলিই ভীষণভাবে সফল হয়েছে। মিশন কন্ট্রোল থেকে ভেসে আসে খুশির বার্তা—‘ক্রু ৯ ফিরল পৃথিবীতে। নিক, আলেকজান্দর, বুচ এবং সুনী, ওয়েলকাম হোম!’ জবাব দেন নিক, ‘কী অসাধারণ যাত্রা! আমি তো গোটা ক্যাপসুল ভর্তি একেবারে কান ছুঁয়ে ফেলা হাসি দেখছি।’ ভাসমান মহাকাশযানের চারপাশে তখন ঢেউ তুলেছে কয়েকটি ডলফিনও, অভিনন্দন জানাতে কার্পণ্য ছিল না বস্তুত কারও। প্রথমে ক্যাপসুলের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন নিক হগ। তারপর একে একে আলেকজান্দর, সুনীতা এবং বুচ। সুনীতাদের মুখে ছিল প্রশান্তির হাসি। স্ট্রেচারে চাপিয়ে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়। খানিকবাদে জাহাজ এসে থামে বন্দরে। সেখানে সুনীতাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বিশেষ গাড়ি। তাতে চেপেই হিউস্টন, নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে। 
কারণ, এখনই বাড়ি ফেরা হচ্ছে না সুনীতাদের। পরিবার বা অন্য কারও সঙ্গে দেখা করতেও পারবেন না তাঁরা। অন্তত দেড়মাস থাকতে হবে চিকিৎসকদের কড়া পর্যবেক্ষণে। সেখানে ব্যায়াম, বিশ্রাম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের সুস্থ করে তোলা হবে। গুজরাতে সুনীতার পৈতৃক গ্রাম রীতিমতো উৎসবে মেতে ওঠে। ‘বেটি’র নিরাপদ প্রত্যাবর্তন কামনায় গ্রামের মন্দিরে ‘অখণ্ড জ্যোতি’ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন বাসিন্দারা। সেই কামনা পূরণ হওয়ার পর এখন তাঁদের প্রত্যাশা, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পরপরই গাঁয়ের মেয়ে অবশ্যই গ্রামে আসবেন। সুনীতাদের অভিনন্দিত করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুনীতাদের অভিনন্দন জানান রাজ্য বিধানসভায় দাঁড়িয়ে। অসামান্য মহাকাশচারী সুনীতার ভারতরত্ন পাওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সুনীতা ভারতের মেয়ে। তাঁকে ভারতরত্ন দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই দাবি সময়োচিত। আমাদের আশা থাকবে, প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে দাবিটি বিবেচনা করবেন। আমেরিকা কিংবা ভারত যেন এই আনন্দের গায়ে চেনা রাজনীতির অবাঞ্ছিত রং না লাগায়। সুনীতাদের পৃথিবীতে ফেরার আনন্দ যেন আমাদের বিজ্ঞানসাধনা, মহাকাশ গবেষণার জন্য বড় প্রেরণা হতে পারে। সবচেয়ে বেশি সাহস সঞ্চার করে যেন মেয়েদের। আপাতত সুনীতা এবং তাঁর সকল সহযাত্রীর দ্রুত স্বাভাবিকতা কামনা করব আমরা। তাঁদের সকলেই ভারতে স্বাগত। সময় সুযোগে তাঁরা এদেশে আসুন এবং আমাদের বিজ্ঞানমনস্ক ছেলেমেয়েদের অনুপ্রাণিত করুন। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ