হিউস্টন: সাদা হেলমেটের ফাঁকেই চওড়া হাসি। ক্যামেরার দিকে ডান হাতটা তুলে ঘনঘন দোলাচ্ছিলেন। মাঝসমুদ্রে ড্রাগন ক্যাপসুলের হ্যাচ খুলে তখন সবে স্ট্রেচারে তোলা হচ্ছিল মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামসকে। বুধবার সেই দৃশ্য আশ্বস্ত করেছিল বহু বিশেষজ্ঞকে। আমেরিকার নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে স্ট্রেচারে শুইয়েই সুনীতাকে নিয়ে আসা হয়েছিল হিউস্টনে, নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে। সেখানে অবশ্য মহাকাশচারীর সাদা পোশাকে নয়, নীল ইউনিফর্মে সামান্য হাঁটতেও দেখা যায় তাঁকে। নাসার কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মেলানোর সময় ধরা পড়ে তাঁর সরু হয়ে আসা কব্জি এবং সেখানে লাগানো আইভি চ্যানেল। তারপর কেটে গিয়েছে ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময়। আইসোলেশনে পাঠানো হয়েছে সুনীতা ও বুচ উইলমোরকে। জনসন স্পেস সেন্টারে শুরু হয়েছে ২৮৬ দিন মহাকাশে কাটিয়ে ফিরে আসা দুই নভশ্চরের ‘রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম’। ৪৫ দিন ধরে চলবে এই পর্ব। কিন্তু তার আগে সুনীতাকে নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় ‘রিহ্যাব টিম’। কারণ, দীর্ঘ সময় মহাকাশ যাপনে সুনীতাদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে গিয়েছে। ফলে এখন কোনওরকম সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ন্যূনতম সর্দিটুকুও যেন না হয়, সেব্যাপারে কড়া সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
এতদিন পর পৃথিবীতে ফিরে মাত্র একঘণ্টার মধ্যে যেভাবে সুনীতা হাত নাড়াচ্ছিলেন, বা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে সামান্য হাঁটতে দেখে অনেকটাই আশ্বস্ত চিকিৎসকরা। যদিও তাঁর শুকিয়ে আসা মুখে গভীর হয়ে আসা বলিরেখা, মাথায় সাদা চুলের আধিক্যে বিধ্বস্ত রূপ ধরা পড়েছে। এমনিতেই মহিলাদের ক্ষেত্রে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে আসার মতো উপসর্গ ধরা পড়ে। মহাশূন্যে সেই সমস্যা আরও বেশি। মাংসপেশিও সংঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হয়, যদিও সুনীতার তেমনটা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়নি। এর আগের মিশনে অবশ্য ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর অন্তঃকর্ণ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল। এবার অবশ্য তা না হওয়ায় খানিক দিগভ্রান্ত দেখিয়েছে তাঁকে। বুধবার থেকেই দুই মহাকাশচারীর ফিজিওথেরাপি শুরু হয়ে গিয়েছে ফ্লাইট সার্জেনদের তত্ত্বাবধানে। তার আগে অবশ্য নাসার মেডিক্যাল গাইডলাইন মেনে বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে তাঁদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা হয়েছে। সঙ্গে ইসিজি এবং ইউএসজি। বৃহস্পতিবার প্রথমে সুনীতাদের উচ্চতা মাপা হয়। দু’দিন ফিজিওথেরাপি পর্ব চলার পর ধীরে ধীরে অন্যান্য ব্যায়াম শুরু করবেন সুনীতারা। প্রথম সপ্তাহে দিনে দু’ঘণ্টা করে ক্রস এলিপ্টিক্যাল ট্রেইনারে ওয়ার্মআপ, সাইক্লিং-রোয়িং করবেন। চলবে পিঠ, কোমর-পা সচল করার এক্সারসাইজও। হাঁটতে হাঁটতে বল ছোড়া কিংবা দড়ি ধরে দোলানোর মতো ব্যায়ামও করানো হবে তাঁদের। সঙ্গে স্ট্রেচিং। প্রতি দিন দু’ঘণ্টা এই সব কসরতের পর চলবে এক ঘণ্টার মাসাজ থেরাপি। দ্বিতীয় সপ্তাহে যাবতীয় এক্সারসাইজের সঙ্গে যোগ হবে হাইড্রোথেরাপি বা সুইমিং পুলের জলে জগিং, অন্যান্য খেলা। তৃতীয় দিনে হবে মস্তিষ্ক, অক্ষিকোটর ও মেরুদণ্ডের এমআরআই এবং চক্ষুপরীক্ষা। মহাকাশে থাকার সুবাদে পাতলা হয়ে এসেছে সুনীতার চামড়া। সেই বিষয়টিও পরীক্ষা করে দেখবেন চিকিৎসকরা। পঞ্চম দিনে ফুসফুসের অবস্থা বোঝার জন্য হবে স্পাইরো-আর্গোমেট্রি। রিহ্যাব শুরুর দিনে এবং দশম দিনে হবে মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন। এই পর্বে শুরু থেকেই মাখন-মাংসের মতো খাবার দেওয়া হচ্ছে সুনীতাকে।