Bartaman Logo
১৮ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

রিল আর রিয়েল নায়ক

রিল আর রিয়েল নায়ক
  • ১৮ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ছিলেন অন্য পেশায়। জীবন এনে দাঁড় করিয়েছে আর এক অচেনা চ্যালেঞ্জের সামনে। সাফল্য এসেছে সেখানেও। পেশার বাঁক বদলে নতুন পথেও জয়ী হলেন যাঁরা, তাঁদের নিয়েই শুরু হল নতুন বিভাগ। এই পর্বে চন্দ্রশেখরন জোসেফ বিজয়। একসময় ছিলেন তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একচ্ছত্র সম্রাট। সেখান থেকে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রথমবার লড়াই করেই তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে অতীতকে বিদায় জানিয়েছেন।

Advertisement

২০১৪ সাল। কলকাতাতেই গোপনে শ্যুট হচ্ছে ‘কাথথি’ সিনেমার হাই-ভোল্টেজ চেজ সিকোয়েন্স। ওই ছবিতে অভিনয় করছেন টোটা রায়চৌধুরী। খলনায়কের চরিত্রে। টোটার দুর্দান্ত শট দেখে বিজয় থালাপতি নিজেই তাঁকে কফি খাওয়ালেন। তারপর সেটে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টররা টোটাকে ফিসফিস করে বললেন, ‘উনি আমাদের রাজ্যের ভবিষ্যৎ মুখ্যমন্ত্রী।’ টোটা সেদিন মনে মনে অবাক হয়েছিলেন। 
সেই ভবিষ্যদ্বাণী এখন মিলে গিয়েছে। তামিলনাড়ুর বাইরে তখন কি কেউ ভেবেছিল, একের পর এক হিট সিনেমার নায়ক রাজনীতিতে প্রথমবার নির্বাচনে লড়েই তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হবেন? সম্ভবত কেউই ভাবেনি।
সেই সময়েই যদি চন্দ্রশেখরন জোসেফ বিজয়কে মানুষ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভাবছিল তাহলে তিনি কেন আরও দশটা বছর অপেক্ষা করলেন? কেন তিনি তখন‌ই রাজনীতিতে এলেন না? এখানেই বিজয় দূরদর্শিতার প্রমাণ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রাজনীতিতেও সিনেমার মতো দীর্ঘ প্রস্তুতি প্রয়োজন। বিজয় তখন তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একচ্ছত্র সম্রাট। তাঁর সিনেমা মানেই বক্স অফিসে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু তিনি হঠাৎ সব ছেড়ে দিলেন কেন? কারণ তাঁর লক্ষ্য ছিল অনেক বড়ো।
বিজয় অভিনীত সিনেমার গল্পে মিশে থাকত সমাজ সচেতনতা। ‘কাথথি’ সিনেমায় তিনি সাধারণ গরিব কৃষকদের উপর কর্পোরেট শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। আবার ‘মেরশাল’-এ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্নীতি নিয়ে তিনি সরব হন। সিনেমায় জিএসটি নীতি নিয়ে একটা কড়া নেতিবাচক সংলাপ ছিল। ব্যস, তাতেই কেঁপে গেল রাজনৈতিক মহল। বিজেপির তামিলনাড়ু শাখা, বিজয়ের ধর্মীয় পরিচয় টেনে এনে কদর্য ট্রোলিং শুরু করে। তাঁর বাড়ির বাইরে তুমুল বিক্ষোভ হয়। আয়কর দপ্তর বিজয়ের বাড়িতে ম্যারাথন তল্লাশি চালায়।
এসবের পরেও আরও বড়ো চমক দিলেন ২০১৮ সালের ‘সরকার’ সিনেমায়। বিজয় সেখানে সুন্দর রামাস্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেন। ভোট দিতে দেশে এসে দেখেন তাঁর ভোট জাল হয়ে গিয়েছে। শুরু হল লড়াই। এই সিনেমায় সরকারের বিনামূল্যে দেওয়া খয়রাতি প্রকল্পকে তীব্র কটাক্ষ করা হয়। ক্ষুব্ধ এআইএডিএমকে সমর্থকরা সিনেমা হলের বাইরে বিজয়ের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত চাপ সৃষ্টি করে কিছু দৃশ্য বাদ দিতে বাধ্য করা হয়। সিনেমার শেষে তাঁর দল বিপুল জয় পেয়েছিল। জনগণ চাইল তিনি নিজে মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু সেখানে এক অভাবনীয় মোড় এল। সুন্দর রামাস্বামী নিজে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসলেন না। তিনি এক সৎ মানুষকে ক্ষমতায় বসালেন। নিজে রইলেন পর্দার আড়ালের আসল কিংমেকার।
কিন্তু পর্দার এই হিরো কি বাস্তবের মাটিতেও বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিলেন? একদমই নয়। ২০২৪ সালে তিনি যখন তাঁর নতুন দল ‘তামিলগা ভেত্রি কড়গম’ (টিভিকে) ঘোষণা করলেন, তখন থেকেই তাঁর আসল অগ্নিপরীক্ষা শুরু হল। তাঁর দলের প্রথম বড়ো রাজনৈতিক জনসভায় ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। থালাপতিকে একঝলক দেখার জন্য প্রায় আট থেকে দশ লক্ষ মানুষের ভিড় উপচে পড়েছিল। চরম অব্যবস্থার কারণে সেখানে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। প্রাণ হারান কয়েকজন অনুরাগী। এই ঘটনায় বিজয়ের দিকে তীব্র সমালোচনার আঙুল ওঠে। তাঁর রাজনৈতিক বিরোধী এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে বলতে শুরু করে, বিজয় শুধু সিনেমার সস্তা হিরো, বাস্তবের দায়িত্ব নিতে তিনি আদৌ সক্ষম নন। বিরোধীদের মূল আক্রমণ ছিল বিজয়ের আদর্শ নিয়ে। ডিএমকে তাঁকে বিজেপির ‘বি-টিম’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
সিনেমার মতো বাস্তবের সংকটও তিনি কাটিয়ে উঠলেন ঠিক হিরোর মতোই। সেই দুর্ঘটনার পর তিনি নিজে মৃতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন। নিজের ভুলত্রুটি শুধরে কোমর বেঁধে নামলেন ভোটযুদ্ধে। এই নির্বাচনে বিজয়ের প্রধান দুই শত্রু ছিল তামিলনাড়ুর তৎকালীন ক্ষমতাসীন ডিএমকে এবং বিরোধী দল এআইএডিএমকে। তবে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির বিকল্প হিসেবে বিজয় নিজেকে তুলে ধরেন।
এই কঠিন লড়াইয়ে বিজয় পাশে পেয়েছিলেন যুব সমাজকে। তাঁর দীর্ঘদিনের অনুরাগী সংগঠন রাতারাতি ক্যাডার বাহিনীতে রূপ নেয়। নির্বাচনের আগে বিজয় কোনো বড়ো দলের সঙ্গে প্রথাগত জোট করেননি। ২০২৬ সালের মে মাসে তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচন হয় ২৩৪টি আসনে। দীর্ঘ ৫৯ বছর ধরে সেখানে দ্রাবিড় দলগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। কেউ কি ভেবেছিল সেই দুর্গ এভাবে ভেঙে চুরমার হবে? ভোটের ফল কিন্তু চমকে দিল সবাইকে। বিজয়ের নতুন দল টিভিকে একাই ১০৮টি আসন জিতে নিল। ডিএমকে আর এআইএডিএমকে-র মতো পুরানো দলগুলোকে পিছনে ফেলে দিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ১১৮টি আসন। বিজয় ম্যাজিক ফিগার থেকে সামান্য দূরে ছিলেন। কিন্তু ভোটের ফল প্রকাশের পর কিছু দল বিজয়কে নিঃশর্ত সমর্থন করল। তাদের আস্থাভোটে বিধানসভায় সহজেই জিতে গেলেন তিনি। ১০ মে ২০২৬, তামিলনাড়ুর ২৩তম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ      নিলেন বিজয়। সাফল্যের চূড়ায় থেকে অভিনয় ছেড়ে দেওয়া কি সহজ ছিল? কোটি কোটি টাকার পারিশ্রমিক ত্যাগ করা মুখের কথা?
বিজয় তা করে দেখিয়েছেন। সিনেমার পর্দার মতো রাজনীতিতেও স্ট্যালিন বা ইডাপাপ্পির মতো প্রতিপক্ষকে টেক্কা দিয়ে, সব ধরনের বিতর্ক আর ট্র্যাজেডিকে সঙ্গে নিয়েই তিনি আজ বিজয়ী। রিল আর বাস্তবের রিয়েল নায়ক।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ