পিনাকী ধোলে, পুরুলিয়া: সোমবার ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৭টা। সবে ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে পুরুলিয়া শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিমট্যাঁড় এলাকার বাসিন্দাদের। এমন সময় হঠাৎ এলাকায় ধুলো উড়িয়ে একের পর এক চারচাকা গাড়ির প্রবেশ। গাড়ির সামনে লেখা, ‘ভারত সরকার, মিনিস্ট্রি অব ফিনান্স।’ গাড়ি থেকে নামতে থাকেন একের পর এক আধিকারিক। সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। সাত সকালে এহেন ঘটনায় কিছুটা হকচকিয়ে যান বাসিন্দারা। এলাকায় শুরু হয় গুঞ্জন। গাড়ি থেকে নেমে আধিকারিকরা সোজা প্রবেশ করেন এলাকার একটি সাদা দোতলা বাড়িতে। বাসিন্দাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না কিছুই। এই বাড়ি নিয়োগ দুর্নীতিতে অন্যতম অভিযুক্ত ‘মিডিলম্যান’ তথা প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ঘনিষ্ঠ’ প্রসন্ন রায়ের শ্বশুরবাড়ি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি নিমট্যাঁড়ের এই বাড়ির মেজ মেয়ে নীলিমার সঙ্গে বিয়ে হয় প্রসন্নর। যদিও দু’জনের যোগাযোগ আরও আগে থেকেই। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নীলিমারা তিন বোন, এক ভাই। নীলিমা, তাঁর দিদি প্রতিমা এবং বোন অনিমা তিনজনই প্রাথমিকে স্কুল শিক্ষকের চাকরি পেয়েছিলেন। একই পরিবার থেকে তিনজন প্রাথমিকে চাকরি পাওয়ায় প্রথম থেকেই ‘সন্দেহ’ হয়েছিল স্থানীয়দের। ২০২২ সালে প্রসন্ন রায় এসএসসি মামলায় সিবিআই-এর হাতে ধরা পড়ে। তাতেই বাসিন্দাদের কাছে দিনের আলোর মতো সবটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অবশ্য দাবি, চাকরির ‘অফার’ ছিল নীলিমার ভাই শুভমের কাছেও। যদিও তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি। কেন? নীলিমাদের উল্টো দিকের বাড়ির বাসিন্দা লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল বলেন, ‘শুভমকে আমরা ছোট বেলা থেকেই চিনি। শুভম ওইভাবে চাকরি পাওয়ার পক্ষপাতী ছিল না। এনিয়ে ওদের বাড়িতে তুমুল আশান্তিও হয়েছিল। শুভম একবার রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়েও গিয়েছিল।’ এদিন ইডি হানা শেষে শুভমও বলেন, ‘আমি যে কোনও ধরনের দুর্নীতির বিপক্ষে। সৎ ভাবেই থাকতে ভালোবাসি। সৎ থাকার জন্য বাড়িও ছেড়েছিলাম।’ প্রসন্নের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না। ইডি তাঁর ব্যাপারে যা যা জানতে চেয়েছিল, বলেছি। আমি সবসময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে রয়েছি।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নীলিমা ও তাঁর বড় দিদি প্রতিমা বিয়ের পর অন্যত্র চলে যান। নিমট্যাঁড়ের এই বাড়িতে থাকতেন নীলিমার বিধবা মা, ভাই শুভম ও ছোট বোন অনিমা। অনিমার অন্যত্র বিয়ে হলেও তিনি বাপের বাড়িতেই থাকেন। তাঁর স্বামী মাঝেমধ্যে আসা যাওয়া করেন। শনিবার বাড়িতে যাঁরা ছিলেন তাঁদের প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করেন ইডির আধিকারিকরা। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের পর বেরিয়ে যান ইডি আধিকারিকরা। যদিও নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত বিশেষ কোনও নথি এই বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়নি বলে খবর।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সূত্রের খবর, নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে নেমে প্রসন্নের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির হদিশ পায় ইডি। ঘুষের টাকায় হোটেল, রিসোর্ট, সুন্দরবনে বিলাসবহুল জলযান সহ একের পর এক সম্পত্তি কেনা হয়েছিল। পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী এবং ঘনিষ্ঠদের কয়েকশো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দুর্নীতির টাকা লেনদেনের হদিশও মেলে। তার সূত্রেই এদিন ইডি তল্লাশি বলে জানা গিয়েছে।