গুরু ছাড়া জ্ঞান লাভ হয় না। শিষ্যের কাছে তিনি শুধু শিক্ষকই নন, পথপদর্শকও বটে। শিষ্যের শক্তি-দুর্বলতা বিবেচনা করে আলোর পথ দেখান প্রকৃত গুরু। এই সম্পর্ক চিরন্তন। আজ শিক্ষক দিবসে বর্তমান পাঠকদের জন্য তিন ছাত্রের শ্রদ্ধাঞ্জলী। কোচ পিকে’কে নিয়ে কলম ধরলেন মজিদ বাসকর। ঠিক তেমনই সত্যজিৎ চ্যাটার্জি এবং প্রবীণ আমরের স্মৃতিচারণ জুড়ে শুধুই অমল দত্ত এবং রমাকান্ত আচরেকর।
শিক্ষক শুধু শিক্ষা দান করেন না, শেখান মূল্যবোধও। রমাকান্ত আচরেকর স্যার আমাকে জীবনে ও মাঠে সোজা ব্যাটে খেলতে শিখিয়েছেন। তিনি শুধু আমার গুরু ছিলেন না, মেন্টর, অভিভাবকও। জীবনের বহু গুরুবপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাঁর পরামর্শেই। ছ’বছর হয়ে গেল স্যারকে হারিয়েছি। তবু মনে হয়, বটবৃক্ষের ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন আজও একইভাবে।
১১টা টেস্ট, ৩৭টি ওয়ান ডে আন্তর্জাতিক ম্যাচ। পরিসংখ্যানের বিচারে আমার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কেরিয়ার খুবই নগণ্য। তবে একজন সাধারণকে তিনি অসাধারণ করে তুলেছিলেন। তাঁর পাঠশালায় ছিল মণিমুক্তোর ছড়াছড়ি। শচীন তেন্ডুলকর, বিনোদ কাম্বলি, চন্দ্রকান্ত পণ্ডিত, অজিত আগরকরের মতো কতশত সফল তারকার উত্থান স্যারের হাত ধরে। সেই তালিকায় জায়গা করে নিতে পেরে আমি সত্যিই ভাগ্যবান।
তখন আমি বছর দশেকের। একদিন শীতের দুপুরে শিবাজী পার্কের আউটফিল্ডে আর পাঁচটা দিনের মতো জমাটি ক্রিকেট। আমাদের খেলা মানে তো ইটের সারি দিয়ে উইকেট। কাঠ কেটে তৈরি ব্যাট দিয়ে গাভাসকর হওয়ার স্বপ্ন দেখা। হঠাৎ একদিন স্যারকে গিয়ে বললাম, ‘আমাদের সঙ্গে ম্যাচ খেলবেন?’ জবাব এল, ‘ক্রিকেটের পোশাক পরে মাঠে আসতে হবে।’ বাড়িতে গিয়ে বলার পর বাবা ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেই ম্যাচে আমরা গো-হারা হেরেছিলাম। যতটুকু মনে পড়ে, ২০ রান করেছিলাম আমি। দল খারাপ খেললেও, আমার খেলা মনে ধরেছিল স্যারের। ম্যাচ শেষে ডেকে বললেন, ক্রিকেট শিখবে? স্যার আমার উত্তরের অপেক্ষা করেননি। কাল তাহলে চলে এসো প্র্যাকটিসে! আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।
মুম্বইয়ের স্কুল ক্রিকেট খুবই জনপ্রিয়। শচীন, কাম্বলি—সব্বাই এই স্কুল ক্রিকেটেরই ফসল। আমিও চুটিয়ে খেলেছি। স্যার বিশ্বাস করতেন, প্রচুর ম্যাচ প্র্যাকটিসও দরকার। তাই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক মাঠ থেকে অন্য মাঠে আমার মতোই শচীনদেরও খেলাতে স্কুটার নিয়ে ঘুরতেন।
ছিয়াশি-সাতাশি মরশুমে মুম্বইয়ের হয়ে রনজি অভিষেক। দলে লড়াই ছিল অনেক বেশি। পরবর্তী সময়ে আচরেকর স্যারের পরামর্শেই রেলওয়েজ ও রাজস্থানে খেলি। মুম্বই ছেড়ে যেতে মন চায়নি। স্যার পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, ‘ভারতীয় দলে খেলতে হলে তোমাকে এই যন্ত্রণা সহ্য করতেই হবে।’
বিরানন্বইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরি। লড়াই কঠিন ছিল, তবে ততটাই তৃপ্তি দিয়েছিল ওই দাপুটে ইনিংস। রেলের হয়ে খেলার সুবাদে পাকা চাকরি আমাকে ও পরিবারকে জুগিয়েছিল নিশ্চয়তা। প্রথম বিমানে চড়া স্যারের সৌজন্যেই।
কোচিং কেরিয়ারে আসা স্যারের হাত ধরে। তিনিই আমার আদর্শ। জানি, তাঁর ১০ শতাংশও হতে পারব না। তবুও আচরেকর স্যারের দেখানো পথেই হাঁটছি। এভাবেই গুরুদক্ষিণা দিতে চাই। ভারতীয় ক্রিকেটের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন স্যার আচরেকর। আমিও সেই পথের পথিক। স্যারের সাফল্যের সামান্যটুকু অর্জন করতে পারলেও নিজেকে ধন্য মনে করব।