নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: রামনবমী উপলক্ষ্যে ডিজের তাণ্ডবে কেঁপে উঠলেন পুরুলিয়াবাসী। পুরুলিয়া শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্র ডিজের দাপট ছিল মাত্রাছাড়া। শব্দদানবের অত্যাচার থেকে ছাড় পেলেন না হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগীরাও। পুরুলিয়া হাসপাতাল রোডেও উচ্চস্বরে বাজল ডিজে। জেলার রামনবমীর মিছিল এদিন স্পষ্টতই বুঝিয়ে দিয়েছে, রামনবমীর এই শোভাযাত্রা যতটা ধর্মীয়, ঠিক ততটাই শক্তি, আধিপত্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনের।
পুরুলিয়া জেলার মধ্যে রামনবমীর সবচেয়ে মিছিলটি হয় পুরুলিয়া শহরেই। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দলের ব্যানারেই মূল মিছিলটি বের হয়। সেই মিছিলের সঙ্গে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আখড়া এসে মেশে। তারপর তা শহর প্রদক্ষিণ করে। আখড়াগুলিই ডিজে নিয়ে আসে। রবিবার পুরুলিয়া শহরের মিছিলে কমপক্ষে ৩০টিরও বেশি ডিজে সেট ছিল বলে অভিযোগ। তারই দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে শহরবাসী। ডিজের তাণ্ডব থেকে বাঁচতে কর্তব্যরত পুলিসকর্মীদেরও কানে তুলে গুঁজে থাকতে দেখা যায় এদিন। যদিও এনিয়ে রামভক্তদের দাবি, যদিও এটা পুরুলিয়ার মানুষের আবেগ। রামের প্রতি সন্মান জ্ঞাপন। তবে, শহরবাসীর দাবি, ২০১৬ সাল পর্যন্তও পুরুলিয়া শহরের বুকে রামনবমী নিয়ে এত মাতামাতি দেখা যায়নি। সাধারণ কলসযাত্রা হতো। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকেই মহা সমারোহে রামনবমী পালিত হচ্ছে। যত সময় এগচ্ছে, ততই মিছিলে ভিড় বাড়ছে।
রবিবার শহরের মিছিলে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি লোক হয়েছিল বলে দাবি পুলিসের। যদিও বিজেপির দাবি, পুলিস কমিয়ে হিসেব দিচ্ছে। মিছিলে ৫০-৬০ হাজারেরও বেশি লোক হয়েছে। জেলা বিজেপির সহ সভাপতি গৌতম রায় বলেন, ‘২০২৬ সালে পুরুলিয়া জেলার বিধানসভা ভোটের ফলাফল কী হবে তা এদিনের মিছিলের ভিড়ই বলে দিয়েছে। মিছিলে ভিড় দেখে তৃণমূল নেতাদেরও বুক কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে আশাকরি।’ পুরুলিয়া শহরের রামনবমীর মিছিলে এদিন ছিলেন বিজেপি সংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাত, প্রাক্তন জেলা সভাপতি বিবেক রাঙা, সহ সভাপতি গৌতম রায় থেকে শুরু করে প্রথম সারির বিজেপি নেতারা। বিজেপি সাংসদকে তলোয়ার হাতে দেখা যায় এদিন। সাংসদের যুক্তি, ‘অস্ত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, মা দুর্গা থেকে শুরু করে সমস্ত দেবদেবীদের হাতেই দেখা যায়। ধর্ম রক্ষার জন্য এই অস্ত্র। এই অস্ত্র শান্তির প্রতীক।’ যদিও ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক মধুসূদন মাহাত বলেন, এদিনের রামনবমীর মিছিল হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাকে সম্পূর্ণ অমান্য করেছে। ডিজের তাণ্ডবে মানুষ অতিষ্ঠ হয়েছে। হাসপাতালে বহু মুমূর্ষু রোগী, বাড়ির বয়স্কদের কাছে এদিনটা ছিল আতঙ্কের। আমরা যে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই ডিজের তাণ্ডব ও অস্ত্র প্রদর্শনের বিপক্ষে।
এদিকে, রামনবমীর মিছিলে সরাসরি অংশ না নিলেও গেরুয়া বসনে দেখা যায় তৃণমূল নেতাদের। রামভক্তদের শসা, ছোলা, তরমুজ, জল খাওয়াতে দেখা যায় তৃণমূল নেতাদের। ছিলেন বর্ষীয়ান নেতা শান্তিরাম মাহাত, বিধায়ক সুশান্ত মাহাত, পুরুলিয়া পুরসভার চেয়ারম্যান নবেন্দু মাহালি প্রমুখ।
এদিন রামনবমী উপলক্ষ্যে পুরুলিয়া শহর ছাড়াও জেলার প্রতি ব্লকেই মিছিল বের হয়। ডিজের তাণ্ডব ছিল সর্বত্রই। প্রতি মিছিলেই ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বহু জায়গায় রাম ও হনুমানের মূর্তি উদ্বোধন হয়। এদিনের সমস্ত মিছিলে অশান্তি ঠেকাতে পুলিসের তত্পরতা ছিল চোখের পড়ার মতো। জেলাজুড়ে প্রচুর পুলিস কর্মী মোতায়েন ছিল। জেলার পুলিস সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এদিন মিছিল একেবারে শান্তিপূর্ণ ভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোনও অশান্তির খবর মেলেনি।