Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

‘আজ ঝেঁপে বৃষ্টি’... কত টাকা বাজি? বড়বাজারে চলত রেইন গ্যাম্বলিং, নিষিদ্ধ করে ইংরেজরা

‘আজ ঝেঁপে বৃষ্টি। হাঁটু পর্যন্ত জল। হোক বাজি।’ ‘আকাশ দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। সন্ধ্যার পর থেমে যাবে।’ দু’জন বাজি ধরলেন। জুটে গেল আরও কয়েকজন।

‘আজ ঝেঁপে বৃষ্টি’... কত টাকা বাজি? বড়বাজারে চলত রেইন গ্যাম্বলিং, নিষিদ্ধ করে ইংরেজরা
  • ২৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: ‘আজ ঝেঁপে বৃষ্টি। হাঁটু পর্যন্ত জল। হোক বাজি।’ ‘আকাশ দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। সন্ধ্যার পর থেমে যাবে।’ দু’জন বাজি ধরলেন। জুটে গেল আরও কয়েকজন। স্যাঁতসেতে সকালে বৃষ্টি নিয়ে ফাটকা খেলা শুরু হল কলকাতায়। বড়বাজারে যে কটন স্ট্রিট আছে... সেই গলির ৬৭ নম্বর বাড়িটিতে বসল বাজির আসর।

Advertisement

মেঘলা দিন। জলে ভিজে গা ম্যাজ ম্যাজ করছে শহরের। অফিস-স্কুল-আদালত-কলেজ, আজ কাজে না গেলেই নয়? এই সময় যদি চোখে পড়ে শহরে বসেছে বৃষ্টি নিয়ে ফাটকার আসর, তাহলে দু’পয়সা কামিয়ে নেওয়ার লোভটা কার না মাথাচাড়া দেয়। জুয়া খেলতে বসে মোহন লাল আর ছেদি বাবু।
মোহন বাজিতে লাগালেন তিন আনা। জিতলে ছেদি বাবু তাকে দু’গুণ ফেরত দেবেন। ছেদি জিতলে মোহন দেবেন তিন আনা। তবে পুরো টাকা কেউ পাবেন না। কমিশন কাটবে জুয়াখানা। বাজির টাকা জমা রেখে দু’জনে একবার আকাশের দিকে তাকায়, একবার দেখে আসে জুয়াখানার ছাদে রাখা ‘মোঢ়ি’ (কাঠের একটি পাত্রবিশেষ)। কেন? কারণ, ওই পাত্রটিতে বৃষ্টির জল পড়ে উপচে যাচ্ছে কি না, তা থেকেই বর্ষার একটা মোটামুটি হিসেব কষা যাবে। তিন আনা তো আজকের কলকাতায় মেলে না! ফলে নিশ্চয়ই বোঝা হয়ে গিয়েছে যে, মোহন-ছেদি হাল আমলের কেউ নয়। আজ থেকে দেড়শো বছর আগে তারা বসেছিল জুয়া খেলতে। কলকাতায় তখন বৃষ্টি নিয়ে ফাটকা চলত রমরমিয়ে। ক্রমেই এই ভয়ঙ্কর খেলা হয়ে ওঠে ভীষণ জনপ্রিয়। গোবিন্দপুর-সুতানটি-কলকাতা তো বটেই, শহরের বাইরে থেকেও লোক আসতে শুরু করে। দলে দলে। শুধুমাত্র জুয়া খেলবে বলে। বহু গরীবগুর্বো বৃষ্টি নিয়ে ফাটকায় টাকা লাগিয়ে হয়ে যায় সর্বস্বান্ত। এসব খবর স্রোতের মতো আসতে শুরু করে ব্রিটিশ সরকারের কাছে। বিপক্ষে লিখতে শুরু করে খবরের কাগজগুলি। শেষে অবস্থা এমন হয় যে, ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট আইন করে বন্ধই করে দেয় বৃষ্টি নিয়ে ফাটকা। জানা যায়, ১৮৯৭ সালের ৩ এপ্রিল সরকার ‘বেঙ্গল রেইন গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ চালু করে। নেপথ্যে একজন বাঙালি, রাষ্ট্রগুরু ‘স্যার’ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দৌলতে ধীরে ধীরে বন্ধ হয় কলকাতায় বৃষ্টি নিয়ে জুয়া। তবে তার আগে নাটক কম হয়নি...! 
জানা যায়, তৎকালীন কলকাতার মারোয়াড়িদের একাংশ ছিলেন এই ফাটকার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের মূলত সঙ্গ দিয়েছিলেন বিহারিরা। তাঁরা জুয়ার টেবল সামলানোর জন্য মাইনে দিয়ে ফড়ে রাখতেন। খেলার টেবলে মূলত দেখা যেত মারোয়াড়ি, বিহারি ও বাঙালিদের। জুয়া বন্ধ হওয়ার পর প্রবল শোরগোল শুরু হয়ে গেল। পাল্টা যুক্তি, ‘ব্রিটিশরা ঘোড়দৌড় বন্ধ করুক। সেটিও জুয়া খেলা’—এই বলে মারাত্মক চেঁচামেচি শহরে। তবে বৃষ্টি-জুয়ায় ইতি টানল আইন।
চিৎপুরে এম জি রোডের গা লাগোয়া বড়বাজারের কটন স্ট্রিট এখনও শহরের ব্যবসার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ঠাসা দোকানপত্র। ঠাসাঠাসি পুরনো বাড়ি। সরু গলি। সেখানে রয়েছে ৬৫ নম্বর বাড়ি। পরের বাড়িটিই ৬৮ নম্বর। ৬৭ নম্বর উধাও। গোরুখোঁজা খুঁজলেও মিলবে না। রেইন গ্যাম্বলিংয়ের মতো ঠিকানাটাও পাততাড়ি গুটিয়ে পালিয়েছে... আধুনিক কলকাতা ছেড়ে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ