নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সাইবার ক্যাফের আড়ালে বিনিয়োগের টোপ দিয়ে চলছিল জালিয়াতি। জালিয়াতদের ‘মানিটারি ব্ল্যাকমেলের’ শিকার হয়ে বছর দুয়েক আগে ভদ্রেশ্বর স্টেশনে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হন সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার উপমা ঘোষ। ওই প্রতারণা ও জালিয়াতির তদন্তে নেমে মুল মাথা মুস্তাফিজুর রহমানকে অসমের নওগাঁ থেকে গ্রেপ্তার করে রাজ্যে নিয়ে এল রেল পুলিস। তার বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ টাকা প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। ভাড়ার অ্যাকাউন্টে জমা পড়ত সাইবার প্রতারণার টাকা। তদন্তকারীরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই কায়দায় প্রতারণা করেছে এই চক্র। যার পরিমাণ ৩০-৪০ কোটি টাকা বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে। এখানে কারা কারা প্রতারিত হয়েছে তা জানার চেষ্টা চলছে।।
২০২৩’এর ২৯ সেপ্টেম্বর ভদ্রেশ্বর স্টেশনের আপ লাইনে এক তরুণীর দেহ উদ্ধার হয়। পরিচয়পত্র দেখে ওই তরুণীর সম্পর্কে জানতে পারে রেল পুলিস। প্রথমে অস্বাভাবিক মৃত্যর মামলা রুজু হয়। ২০২৪’এর ৭ নভেম্বর উপমার বাবা জিআরপিতে অভিযোগ করে জানান, তাঁর মেয়ে ‘মানিটারি ব্ল্যাকমেলিংয়ের’ শিকার হয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন। ওই সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা দেখেন, ২০২২ থেকে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করেছিলেন। যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৮ লক্ষ টাকা। রিটার্ন চাইলে আরও বিনিয়োগ করতে বলে জালিয়াতরা। তা না হলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় তারা। অ্যাকাউন্টে লেনদেনের সূত্র ধরে আখতার নামে এক নওগাঁর অপর এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে শেওড়াফুলি রেল পুলিস।
আখতারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, জালিয়াতির মূল মাথা হলো নওগাঁর বাসিন্দা মুস্তাফিজুর। আখতারের অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করে অফিসাররা দেখেন, সেখানে দেওয়া মোবাইল নম্বরটি মুস্তাফিজুরের। ওই অ্যাকাউন্টেই আত্মঘাতী হওয়া তরুণীর টাকা জমা পড়েছিল। এখান থেকেই রেল পুলিস নিশ্চিত হয়, সাইবার জালিয়াতিতে যোগ রয়েছে মুস্তাফিজুরেরর। আখতার জেরায় জানায়, জালিয়াতির পান্ডার সাইবার ক্যাফে রয়েছে নওগাঁয়। সেখানে আধার, ভোটার কার্ড সহ বিভিন্ন শংসাপত্র তৈরি হয়। আখতার সেখানে লোকজন নিয়ে যেত। সেই সুবাদে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়। তার অ্যাকাউন্ট ভাড়া নিয়েছিল মুস্তাফিজুর। এর বিনিময়ে ভালো টাকা কমিশন পেত আখতার। এরপর শেওড়াফুলি জিআরপি থানার টিম নওগাঁ পৌঁছে মুস্তাফিজুরকে গ্রেপ্তার করে বুধবার রাজ্যে নিয়ে আসে।
মুস্তাফিজুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা জেনেছেন, সাইবার ক্যাফেতে বসে সে বিভিন্নজনের নম্বর জোগাড় করে তাদের গ্রুপে অ্যাড করত। ভদ্রেশ্বরের বাসিন্দা সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার উপমাকেও তাতে অ্যাড করা হয়। কোথায় বিনিয়োগ করলে ভালো টাকা মিলবে, তার তালিকা পাঠানো হয়। তাতে ওই তরুণী আশ্বস্ত হলে বিনিয়োগ শুরু করেন। এরপর টাকা ফেরত চাইলে অভিযুক্ত ওই তরুণীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেয়। তদন্তকারীরা বলছেন, শুধু ওই সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার একা নন, তার ফাঁদে পড়েছে আরও অনেকেই।