সংবাদদাতা, রায়গঞ্জ: কথায় আছে, যে রাধে সে চুলও বাঁধে। নারীদের উদ্দেশে বহুল প্রচলিত এই বাক্য দীর্ঘদিনের হলেও সময়ের সঙ্গে নারীরা আরও বেশি সক্রিয় হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। রান্নাঘরের বাইরে বেরিয়ে জীবন-সংগ্রামও করে চলেছেন। রায়গঞ্জ শহরের বুকেও এমন নারীর সংগ্রামের কাহিনি রয়েছেন। যেমন নমিতা ঘোষ। যিনি সংসার সামলানোর পাশাপাশি পার্সেল ডেলিভারির কাজ করছেন। রায়গঞ্জ শহরে একমাত্র পার্সেল ডেলিভারি গার্ল হিসেবে পরিচিত রায়গঞ্জের বাসিন্দা নমিতা। রায়গঞ্জের তুলসীতলায় একটি ভাড়াঘরে দুই সন্তানকে নিয়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন নমিতা। ২০২১ সালে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কে জটিলতার কারণে তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল শ্বশুরবাড়ি। তারপর থেকেই চলছে বছর চল্লিশের এই মহিলার জীবন-যুদ্ধ। মাঝে রায়গঞ্জের শ্যামপুরের বাসিন্দা স্বামীর সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি হওয়ায় পুনরায় সংসার করার পরিকল্পনা থাকলেও ভাগ্যের পরিহাসে তা আর হয়নি। দেড় বছর আগে অসুখে স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় নমিতার আর ফেরা হয়নি শ্বশুরবাড়ি। তারপর থেকে নেমে পড়েছেন কর্মজগতে- পার্সেল ডেলিভারির কাজে। পিঠে বড় ব্যাগ নিয়ে স্কুটারে চেপে শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে চলেছেন। শহরের মানুষ এখন তাঁকে ‘ডেলিভারি গার্ল’ নামেই বেশি চেনেন।
এই কাজ বেছে নেওয়ার কারণ কী? নমিতা বললেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুয়ায়ী আমি অন্য কাজও খুঁজেছি। কিন্তু সেই কাজে অত টাকা ছিল না। যা দিয়ে আমার দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি সংসার চলবে। বাধ্য হয়েই আমি এই পেশা বেছে নিই। এখানে টাকাটা একটু বেশি। নমিতার সংযোজন, প্রথম প্রথম ব্যাগ পিঠে নিয়ে বাড়ি বাড়ি পার্সেল দেওয়া শক্ত ছিল। এখন অনেকটা সহজ হয়েছে। এখনও বিয়ের পরের কথা ভাবলে চোখে জল আসে নমিতার। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,তাঁর স্বামী সরকারি চাকুরীজীবী ছিলেন। আর পাঁচটা বধূর মতো নমিতার জীবনও অনেকটা মসৃণ হতে পারত। কিন্তু হয়নি। যদিও পিছন ফিরে দেখতে নারাজ নমিতা। সন্তানদের মানুষ করতেই এখন তাঁর জীবন-সংগ্রাম। নমিতা বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৪০ টা পার্সেল ডেলিভারি করার টার্গেট থাকে। কোনও কোনওদিন সেই সংখ্যাটা দ্বিগুণও হয়ে যায়। স্কুটার ও ব্যাগ নিয়ে রায়গঞ্জ শহরের রবীন্দ্রপল্লি, নেতাজিপল্লি, তুলসীতলার নানা এলাকা ঘুরে পার্সেল ডেলিভারি করেন। শহরের বাসিন্দা সঞ্চিতা বণিক দেবনাথ বলেন, মহিলা হিসেবে একমাত্র তাঁকেই স্কুটার নিয়ে এত পার্সেল নিয়ে ডেলিভারি করতে দেখি। মহিলারা এখন অনেক কাজই করেন। তবে তাঁর এই লড়াইকে মহিলা হিসেবে কুর্নিশ জানাই। নমিতার সহকর্মী অভয় সিং বলেন, নমিতা দেবীই একমাত্র মহিলা ডেলিভারি গার্ল। রায়গঞ্জ শহরেই তিনি ডেলিভারি করেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নমিতার জীবন সংগ্রামকে কুর্নিশ জানায় রায়গঞ্জবাসী। পার্সেল বিলি করছেন রায়গঞ্জের বাসিন্দা নমিতা ঘোষ।-নিজস্ব চিত্র