সমীর মাহাত, ঝাড়গ্রাম: বুধবার থেকে ঝাড়গ্রাম সহ গোটা জঙ্গলমহলে শুরু হচ্ছে ‹রহিন› পরব। এই পরব মূলত কৃষিকেন্দ্রিক। নিয়ম রীতি মেনেই বহু প্রাচীনকাল থেকে কৃষিজীবি কুড়মি জনজাতি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রহিন পরব পালন করে আসছে।› রহিন ‹পরব। উচ্চারণ ভেদে একে ‹রহইন› বা ‹রহৈন›ও বলা হয়। পাঁজিপুঁথি আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই প্রতিবছর ১৩ জ্যৈষ্ঠ থেকে এই পরব শুরু হয়। চলে সাত দিন। রহিনের প্রথম দিন থেকে সাতদিন নির্ঘণ্ট দেখে সন্ধ্যায় মহিলারা জমি থেকে ‹রহিনমাটি ‹সংগ্রহ করে ঘরে আনেন। সেই মাটি ঠাকুর পিঁড়া গোড়ায় রেখে পুজো করা হয়। পরে ঘরের চার কোনার চালে ও মাচায় ধান যত্ন করে রাখা হয়।
ঝাড়গ্রামের কুড়মালি কবি ও সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ মঙ্গল মাহাত বলেন, আমাদের সমস্ত লোক উৎসব ও সংস্কৃতি কৃষি ও প্রকৃতিকেন্দ্রিক। এই ১৩ জৈষ্ঠ্য থেকে সূর্য ও রোহিনী নক্ষত্রের তেজ যুগ্মভাবে পৃথিবীর উপর পড়ে। রোহিনের প্রথম দিনে জমিতে ধানের ‹মুইট› বার করেন। ঘরের বড় বা ছোট ব্যাক্তিরা কৃষি কাজের এই নিয়মের কাজটি করেন। রহিনের সাতদিন তাদের শাক খাওয়া নিষেধ। লোক বিশ্বাস চাষের জমি ঘাস বা আগাছা না হওয়ার জন্য এই নিয়ম। আমাদের পূর্বপুরুষরা এই সময়টাতে কৃষি কাজের বীজ বপন করতেন।
লোক বিশ্বাস মতে, রোহিন হল একটি সময়ের নির্ঘণ্ট বা সিজন। রহিন মাটি, রোহিন ফল, রোহিন পোকা বিভিন্ন উপকরণের সঙ্গে এই শব্দটি যুক্ত রয়েছে। রহিন মাটি আদিকালে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
রহিন পরবকে কেন্দ্র করে এই সময় গ্রামে গ্রামে নাচগানে মেতে ওঠেন গোটা জঙ্গলমহলের কুড়মি জনজাতির মানুষ। এই সময়ই মাটি থেকে লাল মাকড়শা জাতীয় পোকার দেখা মেলে। যা ‹রহিনপোকা› নামে পরিচিত। লোক বিশ্বাস, এই সময় জঙ্গলের রহিন ফল খেলে সারা বছর সাপের কামড়ের বিষ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। রহিনের সময় বৃষ্টি না হলে সে বছর সাপের বিষ অধিক হয় বলে লোক বিশ্বাস রয়েছে। রহিন শেষ হলে শুরু হয় ‹ডাহা› পালন। রহিন শব্দটি প্রকৃত অর্থ সবুজায়ন। ডাহা অর্থে তাপ। ডাহা থেকে ডাহান তা থেকে দহন শব্দটি এসেছে। এক্ষেত্রে সূর্যের তাপকেই বোঝানো হয়। সেই সঙ্গে এই রহিনের সময় আদি কালে সহজিয়া ‹ডাক› সাধনার জন্য যে মন্ত্র সাধনার শিক্ষা দেওয়া হয়। তার জন্য ‹আখড়া› বসত। এই সময় নতুন আখড়া বা পাঠশালার উদ্বোধন হতো। ঝুমুর লেখক ও কুড়মালি সাহিত্যিক অমিয় মাহাত বলেন, রহিন কৃষিকেন্দ্রীক উৎসব।এই সময় বীজ বপন করলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ শষ্যের রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়।