Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

পোড়া ল্যাটা পেলে খুশি রঘুর শ্যামা, গগনের কালীর ভোগ হয় ভাজা মটরে

বাঙালির সাহিত্য থেকে জনশ্রুতি, বাস্তব থেকে পরাবাস্তবে হরিহর আত্মা হয়ে জুড়ে আছে ডাকাত আর কালীপুজো। সুবে বাংলার ডাকাতদের একদা ‘মৃগয়াক্ষেত্র’ ছিল সাবেক হুগলি জেলা।

পোড়া ল্যাটা পেলে খুশি রঘুর শ্যামা, গগনের কালীর ভোগ হয় ভাজা মটরে
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: বাঙালির সাহিত্য থেকে জনশ্রুতি, বাস্তব থেকে পরাবাস্তবে হরিহর আত্মা হয়ে জুড়ে আছে ডাকাত আর কালীপুজো। সুবে বাংলার ডাকাতদের একদা ‘মৃগয়াক্ষেত্র’ ছিল সাবেক হুগলি জেলা। সেই ইতিহাসের সাক্ষী দেয় ইংরেজ আমলের নথি। বাংলার প্রথম ও শেষ ডাকাতিয়া কমিশনের সদর দপ্তর ছিল বর্তমান হুগলি জেলাতেই। আর হবে নাই বা কেন, রঘু থেকে গগন, বিশে, বাংলার দাপুটে ডাকাতদের ডেরা যে ছিল হুগলিতেই। আজ আর ‘হা রে রে’ ধ্বনি নেই। রঘু, গগনরা স্থান পেয়েছে গল্পের পাতায়। কিন্তু রয়ে গিয়েছে তাদের নামের সঙ্গে জনশ্রুতিতে জুড়ে থাকা কালীপুজো। দীপাবলির অন্ধকার রাতে সেই সব মন্দিরে আজ সাধারণ মানুষের ভিড় জমে, সঙ্গে ভিড় করে জনশ্রুতির প্রলম্বিত ধারা। 

Advertisement

হুগলির জনশ্রুতি অনুসারে মা সারদা ডাকাতের খপ্পরে পড়েছিলেন। সে বহুযুগ আগের কথা। আজ সিঙ্গুরের নানা পরিচয় তৈরি হয়েছে। কিন্তু সারদা মায়ের গল্পে সিঙ্গুরের পরিচিতি গগন ডাকাতের নামে। সিঙ্গুরের পুরুষোত্তমপুরে কালীসাধনা করত গগন। একবার পরমহংস অসুস্থ শুনে কামারহাটি থেকে দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছিলেন সারদামণি। পথে গগনের দলবলের খপ্পরে পড়েন তিনি। জনশ্রুতি, গগন যখন মা সারদার কাছে আসে, তখন তার মধ্যে এসেছিল পরিবর্তন। মায়ের মধ্যে জগজ্জননী কালীকে দেখতে পেয়েছিল দুর্দান্ত সেই ডাকাত। রক্ষা পেয়েছিলেন সারদাদেবী। তবে হাতের কাছে মা’কে পেয়ে গগন নাকি কিছুতেই ছাড়তে চায়নি। মা’কে চাল ও কলাই ভাজা খাইয়েছিল গগন। দলবল নিয়ে নিরাপদে দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছেও দিয়ে এসেছিল। আজও কলাই ভাজা ছাড়া পুরুষোত্তমপুরের ডাকাত গগনের আরাধ্য কালীর ভোগ হয় না।
নদীর গভীর ঘূর্ণিময় অংশকে সাবেক বাংলায় ‘দহ’ বলা হতো। আর এই দহগুলি ছিল ডাকাতদের হামলার উপযুক্ত জায়গা। হুগলির বলাগড়ের ডুমুরদহ সেই সময় কম্পমান ছিল বিশে ওরফে বিশ্বনাথ ডাকাতের নামে। কুখ্যাত বিশে ডুমুরদহ শাসন করত। জনশ্রুতি, ডুমুরদহের বুনোকালী তারই আরাধ্য দেবী। ডাকাতদের রমরমার কালে বুনোকালীর মন্দিরে নরবলি প্রথা চালু ছিল। কালের খেয়ালে বুনোকালী মন্দিরে আজ বৈষ্ণবমতে পুজো হয়। কেউ বলির মানত করলে ছাগের কান কেটে দেবীকে দেওয়া হয়। দুর্দান্ত বিশে একদা ঘুম কেড়ে নিয়েছিল বাংলার জমিদার তো বটেই, ব্রিটিশ শাসকেরও। আজও পুজোর কালে বাতাসে ভেসে বেড়ায় বিশের পল্লবিত কল্পকথা।
বাংলায় আরও পরিচিত নাম ছিল রঘুর। কেউ কেউ বলেন, একাধিক রঘু ডাকাত ছিল বাংলায়। হুগলির পুণ্যতীর্থ ত্রিবেণীর কালীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রঘু ডাকাতের নাম। প্রাচীন বন্দরনগর সপ্তগ্রামের বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছিল বাসুদেবপুর। সেখানে আজও পুজো হয় রঘুর দক্ষিণাকালীর। জনশ্রুতি, রঘুর হাত ঘুরে ওই পুজো গিয়েছিল তার শিষ্য বুধোর হাতে। ত্রিবেণীর ভীষণ দর্শন ডাকাতিয়া কালীর ভোগও ভীষণ। পোড়া ল্যাটা ছাড়া দেবীর ভোগ সম্পূর্ণ হয় না। 
হুগলিতে বহুবার বাঁক বদলেছে পূণ্যতোয়া গঙ্গা। সেই বাঁক বদলের তালে তাল মিলিয়ে জনপদ বদলেছে তার ধারা। ডাকাতিয়া কালীর চরণে আজ আধুনিক মানুষের নৈবেদ্য পড়ে। তবুও আঁধার রাতের রক্তজবায় মিশে থাকে রক্তঝরা কাল আর ভক্তির জনশ্রুতি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ