নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর ও সংবাদদাতা, জঙ্গিপুর: ওয়াকফ বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে কর্মসূচি ঘিরে রণক্ষেত্র হয়ে উঠল মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ। লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ছোড়া, পুলিসকে লক্ষ করে ইটবৃষ্টি, গাড়িতে আগুন কিছুই বাদ রইল না। জাতীয় সড়ক ভরে উঠল মানুষের আর্ত চিৎকারে।
মঙ্গলবার বিকেলে ওয়াকফ বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে প্রায় হাজার খানেক মানুষ রঘুনাথগঞ্জের উমরপুরে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে। অবরোধের ফলে জাতীয় সড়কের দু’টি লেনই কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে হয়ে পড়ে। আটকে পড়ে প্রচুর যানবাহন। পুলিস জাতীয় সড়ক অবরোধ মুক্ত করতে বিক্ষোভকারীদের হঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। জাতীয় সড়ক থেকে রঘুনাথগঞ্জের দিকে চলে গিয়েছে জঙ্গিপুর-লালগোলা রাজ্য সড়ক। সেখানেও কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হয়। এরপরই আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিস লাঠিচার্জ করে বলে অভিযোগ। প্রতিবাদকারীরা তখন পুলিসকে লক্ষ্য করে ইটবৃষ্টি শুরু করে। পুলিস পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার সেল ছোড়ে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছিল না বিক্ষোভকারীদের। তারা জঙ্গিপুরের এসডিপিও ও বেশ কয়েকজন পুলিসের আধিকারিকের গাড়িতে ভাঙচুর চালায়। তারপর তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিসকে লক্ষ করে লাগাতার ইটপাটকেল ছোড়ে বিক্ষোভকারীরা। পরে বিশাল পুলিস বাহিনী ঘটনাস্থলে আসে। অনেককে গ্রেপ্তার করে পুলিস। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে দমকলের দু’টি গাড়িও। জাতীয় সড়ক দিয়ে যাওয়া গাড়িও ছাড় পায়নি বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ থেকে। আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন সাধারণ মানুষ। জাতীয় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। জঙ্গিপুরের এসডিপিও প্রবীর মণ্ডল বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এখনই বলা যাচ্ছে না। জঙ্গিপুরের বিধায়ক জাকির হোসেন বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী আমাকে ফোন করেছিলেন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে বলেছেন। পুলিস চেষ্টা চালাচ্ছে। আমরাও চেষ্টা করছি। সবাইকে অনুরোধ, কেউ কোনও প্ররোচনায় পা দেবেন না। শান্তি বজায় রাখুন। কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী বলেন, ওয়াকফ ইস্যুতে একটি আন্দোলন ঘিরে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এটা খুবই চিন্তার বিষয়। আমাদের অনুরোধ, ওয়াকফ নিয়ে কোনও আন্দোলন যেন সাম্প্রদায়িক রং না নেয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিস লাঠিতে বিক্ষোভকারীদের মাথা ফেটেছে। একাধিক রক্তাক্ত যুবককে সরিয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায় আন্দোলনকারীদের। এরপরও লাঠিচার্জ অব্যাহত রাখে পুলিস। তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে জনতা। পুলিসকে লক্ষ্য করে ইট ও পাথর ছোড়ে। এই ঘটনায় কয়েকজন পুলিসকর্মীও জখম হয়েছেন। ইটবৃষ্টিতে পুলিস সাময়িক সরে যেতেই গাড়িতে ভাঙচুর চালায় বিক্ষোভকারীরা। তারপর আগুন ধরিয়ে দেয়। পরপর দু’টি পুলিসের গাড়ি দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর দমকলের দু’টি গাড়ি এসে আগুন নেভায়। যদিও গাড়িগুলি পুড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে।
জাতীয় সড়কে কয়েকটি গাড়ি থেকে যাত্রীরা নেমে পালিয়ে যায়। সেই সমস্ত গাড়িতে ভাঙচুর চালায় বিক্ষোভকারীরা। এক মহিলা যাত্রী বলেন, খুব আতঙ্কে রয়েছি। পাশে পুলিসের গাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলছে। যে কোনও মুহূর্তে আমাদের গাড়িটা পুড়ে যেতে পারে। স্থানীয়দের জল ঢালার জন্য বললেও কেউ কান দেয়নি। যখন আমাদের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়, এখানে কোনও পুলিসও ছিল না। আমরা আতঙ্কিত হয়ে গাড়ি ছেড়ে পাশের একটি দোকানে গা ঢাকা দিয়েছিলাম। রাত আটটাতেও জাতীয় সড়কে যান চলাচল শুরু হয়নি। থমথম করছে গোটা এলাকা। পুলিস পুরোপুরি রাস্তার দখল নিয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন জায়গায়।