রঘুডাকাত ও লুটকালী
  • ৮ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রূপক বর্ধন রায়: ইংরেজিতে ‘হাঞ্চ ফিলিং’ বলে একটা কথা আছে। একটা খটকা, একটা সন্দেহ, কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই ‘যা ভাবছি, তা হতেও পারে’র একটা অনুভব। তারও একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে, যার নাম অনুশীলন। খোঁজার অনুশীলনে থাকতে থাকতে যে কোনো ধরনের প্যাটার্ন চিনে নেওয়ার অনুভব। তেমনই একটা সন্দেহ জেগেছিল ‘লুটকালী’ পুজো, হাওড়া জেলা, পাঁচলার সাহাপুর ও রঘুদেবপুর, পশ্চিমবঙ্গীয় ঘোষ পদবি ইত্যাদি সূত্রগুলি মনে মনে জুড়তে গিয়ে। ‘লুটকালী’—এই নামটা শুনে, সেই পুজো যে কোনো এক সময়ে বাংলার কোনো এক ডাকাত দলের পুজো ছিল, এমন কথা কি প্রথমেই মনে আসে না? এহেন ‘লুটকালী’র বিষয়ে খবরের কাগজে যেটুকু পাচ্ছি, তা হুবহু এই—

Advertisement

‘...স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে পুজো সমাপ্তির পর বেড়া ভেঙ্গে ফলমুল, প্রসাদ এসমস্ত কিছু লুট করতে হবে... সারা রাতে মোট তিনবার এই লুট চলে।... কথিত আছে, বাংলার নবাব সিরাজদৌল্লার আমলে চারিদিক ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে কয়েকজন ডাকাতের বসবাস ছিল, তাদের প্রভাব ছিল... তারাই মূলত ডাকাতির প্রাক্কালে একত্রে জড়ো হয়ে ১৪ ফুটের (এটা অবশ্য ভুল, ১৪ পোয়া হবে) প্রতিমা নির্মাণ করে কালীপুজো করতেন।... এসময়ে নরবলি প্রথাও চলত।’
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ গপ্পো এহেন খাপছাড়াভাবে দেখতে খারাপ লাগে। তাই সাহাপুরের ঘোষ পরিবারের অন্যতম উত্তরাধিকারী তথা ভগ্নীপতি সায়নের সঙ্গে আড্ডার ফাঁকেই নানান প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি খনন। মূল প্রশ্ন, ‘এত পুরানো ডাকাতকালী পুজোর কাছেই এক গ্রামের নাম ‘রঘু’দেবপুর, ব্যাপারটা কি একেবারেই কাকতালীয়?’
পরবর্তীতে কথা শুরু হয় সায়নের দাদা শান্তনু ঘোষের সঙ্গে। অন্যান্য গ্রামবাসীদের সঙ্গে শান্তনু এবং সায়নদের গোটা ঘোষ পরিবারই এখন সাহাপুরের এই লুটকালী পুজোর মূল দায়িত্বে। শান্তনুদা বললেন, ‘আমার ঠাকুরদা, বাবা সকলের মুখেই শুনেছি যে, এই পুজো প্রায় তিনশো বছরের। আগে এটা ডাকাতদের পুজো ছিল। তাই আগের লুটের মেজাজ ধরে রাখতে এখনও প্রসাদ লুট হয়। প্যান্ডেল ঘেরা হয় না। পুজোর দিন প্রতিমার চারপাশে বেষ্টনী করে, বাঁশ দিয়ে ঘিরে প্রসাদ জমানো হয়। পুজোর পর মোট তিনবারে যে যেমন পারে, প্রসাদ লুট করে নিয়ে যায়। তার মধ্যে চাল, ডাল, গোটা ফল সবই থাকে।’ 
লুট পর্ব তো হল। আর পুজোর পদ্ধতি? জানা গেল, আগেকার দিনে পুজোর পর  শেষ প্রহরে লুট হত। সেটাই এখন তিনবারে হয়। পুজো হয় মাটির মূর্তি তৈরি করে। যেদিন পুজো, সেদিনই প্রতিমা রং করতে হয়। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ পুজোয় বসার আগে পর্যন্ত ঠাকুর তৈরি হবে। গত ৭০-৮০ বছর ধরে এটাই নিয়ম। এর সঙ্গেই পুরানো বলির প্রথা এখনও এখানে চলছে। তবে মানুষ-বলি এখানে কখনো হয়েছে কি না, সেকথা জানা নেই। এখন ছাগ-বলির দিন হাড়িকাট লাগানো হয়, তারপর আবার সেটাকে তুলে নেওয়া হয়। তাছাড়া সাহাপুরে আরও একটা নিয়ম রয়েছে। এখানে অন্য যে কোনো পুজো হওয়ার আগে লুটকালীর পুজো দিতেই হবে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, অন্যথায় কোনো না কোনো অমঙ্গল হবে। প্রসঙ্গত, ১৭৭০ সালে সোমড়া গ্রামে নরবলির উল্লেখ নথিবদ্ধ আছে (যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত)।
এরপর পুজোর ইতিহাস সম্বন্ধে পাওয়া ইতিহাস এবং হাওড়া জেলার নানান নথি মিলিয়ে জানা যায়, একসময় এই জায়গাগুলি পুরোটাই বর্ধমান রাজাদের অধীনে ছিল। আর সেই সুত্রে সাঁকরাইলের সরসী চরণ ঘোষের নাম উঠে আসে। সাঁকরাইলের অভয় চরণ ঘোষ মেমোরিয়াল স্কুলের ওয়েবসাইটে তাঁর ও তাঁর পরিবারের একাধিক মানুষের নাম আছে। আরও পরে, বর্ধমান রাজবাড়ির অধীনস্ত নায়েব আশু বা আশুতোষ রায় পুজোর দায়িত্বে আসেন। স্বভাবতই আশু রায়ের অনুপস্থিতিতে তাঁর দুই ছেলে তারাপদ রায় এবং শ্যামাপদ রায় আরও বেশ কিছু বছর পুজোর দায়িত্ব ছিলেন। গত ৭৫ বছর ধরে গ্রামের মানুষজন সাহাপুর শক্তি সংঘের পরিচালনায় এই লুটকালী পুজো করে চলেছেন। 
শান্তনুদা আরও বলেন, ‘পুরানো দিনে ১৪ পোয়ের ঠাকুর হলেও, আজ বাড়তে বাড়তে প্রতিমা ১৭ ফুটের। তাছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু খুচরো পরিবর্তনও ঘটেছে। এখন যে মাঠে পুজোর বেদি করা হয়েছে, মূল পুজোটা সেখান থেকে আরও ২০ বা ৩০ গজ দূরে ছিল। তাছাড়া, ছাগ-বলিতে সেই বহু পুরানো খাঁড়া এখনও ব্যবহৃত হয়। আর একটা কথা তোমায় বলি, আমাদের গ্রামের সকলেই কিন্তু কালীভক্ত।’
এক প্রাচীন ডাকাত-কালীর উৎস সন্ধানের কাজে এই শেষ কথাটা যে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, তা বাংলার ডাকাতদের ২০০-২৫০ বছরের ইতিহাসে আগ্রহী সকলেই জানেন।  ঔপনিবেশিক অবিভক্ত বাংলায় ডাকাতদের ইতিহাস নিয়ে রচিত যে তাত্ত্বিক কাজগুলিকে মাইলফলক ধরা হয় সেগুলি, ১৮৫০ ও তার পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকারের ‘সাপ্রেশন অব ডেকয়টি ইন বেঙ্গল’-এর নথি, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত রচিত ‘বাংলার ডাকাত’ এবং তার সঙ্গে সামগ্রিক ডাকাত সাহিত্যেই বাংলার ডাকাতদের কালী ভক্তি এবং ‘ডাকাতদের গ্রাম’ কথাটার ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা শান্তনুদার উক্তিকে ঐতিহাসিক ভিত্তি দেয়। যোগেন্দ্র গুপ্ত যেমন লিখেছেন, 
‘বাংলার ডাকাতদের ইতিহাস আলোচনা করিয়া একথা সত্য জানি যে, তাহারা নারী জাতির প্রতি কোনোদিন কোনো অত্যাচার করিত না। তাহারা মনে করিত নারী কালিমায়ের জাত। নারীকে দেখিতে মায়ের মতো। কোনো ডাকাত দিনের বেলায় হউক কিংবা রাত্রি বেলায় হউক কোনো ভদ্রঘরের বা নিম্নশ্রেণীর নারীর প্রতি কোনোরূপ অপমান করিয়াছে বলিয়া শোনা যায় নাই। বাংলার ডাকাতদের এই চরিত্র বল ছিল একান্ত প্রশংসনীয়।...’
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই অনুরণন থেকে এহেন লুট-কালীর সঙ্গে জড়িত নির্দিষ্ট ডাকাতদলকে চিহ্নিত করা কি সম্ভব? এবং সেই কাজ করতে হলে আমাদের হাতে যা তথ্য রয়েছে, তার মধ্যে কোনগুলিকে ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রথমে সময়ের ব্যাপ্তিতে চোখ বোলানো যাক। ব্রিটিশদের ‘সাপ্রেশান অফ ড্যাকয়েটি ইন বেঙ্গল ১৮৫৫-৫৬’ নামক রিপোর্ট বলছে, ১৮০১-০৬ সালের প্রথম তরঙ্গের (১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফল) পর ১৮৫১ সালে ডাকাতির দ্বিতীয় তরঙ্গ তার শীর্ষে পৌঁছায়। বেশিরভাগ দলেরই মূল লক্ষ্য ছিল হয় ইংরেজ ও দেশি ব্যবসায়ী বা ইংরেজ ‘ঘনিষ্ঠ’ জমিদাররা। ‘সাপ্রেশন অব ড্যাকয়েটি ডিপার্টমেন্ট’ চালু হওয়ার পর নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০) পর্যন্ত তা কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। আর, ১৮৫০-১৮৫৫ সালের মধ্যে ডাকাতির নিরিখে প্রধান যে চারটে জেলার নাম পাই, সেগুলি হল বর্ধমান, নদীয়া, হাওড়া ও হুগলি। এরপর নীল বিদ্রোহ ও তার পরবর্তী বিস্তীর্ণ সময়টুকু ছাড়িয়ে আমরা দেখতে পাই ১৮ অক্টোবর, ১৮৮২ সালের ক্যালকাটা গেজেট নথিতে পাঁচলা থানার উল্লেখ আছে, অর্থাৎ এর আগেই পাঁচলা থানার অস্তিত্ব ছিল। 
এই যে বিস্তীর্ণ তিন দশকের একটা সাময়িক পটভূমি, তার গোটাটা জুড়ে ব্রিটিশ রিপোর্টে মানিক ঘোষ, কুবের ঘোষ, বিষ্টু ঘোষ, দেবী ঘোষ, নবীন ঘোষ, মনোহর ঘোষ, রঘুনাথ ঘোষ ইত্যাদি নামগুলির উল্লেখ ডাকাত সর্দার হিসাবে পাই, এবং দু’-একজনকে বাদ দিলে এঁদের বেশিরভাগেরই মূল কর্মস্থল জলজ দক্ষিণবঙ্গ। তাত্ত্বিক গবেষকরা জানান যে, কিছু জমিদার-ডাকাত ও জনাকয়েক বাগদি, ডোম পদবি ছাড়া ঘোষ, রায়-রাই মূলত এ অঞ্চলের দলগুলির সর্দার ছিলেন। কাজেই প্রশ্ন ওঠে, এদেরই কেউ বা তাদের দলবলের কেউ এই পুজো শুরু করে থাকতে পারেন কি? 
ওই যে লেখার শুরুতেই ‘হাঞ্চ ফিলিং’-এর উল্লেখ করেছিলাম, ঠিক এই জায়গায় সেটা কাজে লেগে গেল। শুধু পাঁচলা থানার ভৌগলিক অবস্থান, সাহাপুরের লুটকালী এবং তার ঠিক পাশেই ‘রঘু’দেবপুর নামক আরেকটা গ্রাম, উনিশ শতকের হাওড়া জেলার ভৌগলিক প্রকৃতি এবং বিভিন্ন দলের দস্যুবৃত্তি ও ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের পদ্ধতি বিষয়ক তথ্যগুলিকে এক জায়গায় এনে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে যে নামটা বারংবার উঠে এল, তা হল— রঘু ডাকাত।
এই লুটকালী পুজো যে তিনি বা তাঁর দলেরই কেউ একসময় করে থাকতে পারেন, সেই তত্ত্বে কীভাবে উপনীত হওয়া যেতে পারে, সেই প্রসঙ্গে আসি। প্রথমত, রঘু ডাকাতের সম্পূর্ণ নাম ও পদবি যে রঘুনাথ ঘোষ, সেই তথ্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে আছে। তাছাড়া, নদীয়ার যে মন্দিরকে রঘু ডাকাতের পুজো বলে লোকে চেনে, সেটা যে আদপে তাঁর ভাই বিধুভূষণ ঘোষের পুজো সে কথাও মন্দিরের ইতিহাসে বলা আছে। তাছাড়া অনিলাভ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘রঘুডাকাত’ বইয়ের (নাটক) ভূমিকায় লিখছেন—‘...রঘু ডাকাত সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য ইতিহাস নেই। যা আছে, তা সবই চলতি প্রবচন আর গল্পকথা।’ যোগেন্দ্র গুপ্ত লিখছেন, ‘রঘু ডাকাতের উপদ্রব বিশেষ করিয়া নৈহাটি থানা ও বারাসাতের কদমগাছি থানা এবং হুগলি, চব্বিশ পরগণা পর্যন্ত ব্যাপ্ত ছিল।’ এইটুকু তথ্য থেকে নির্দিষ্ট করে যে কিছুই বলার উপায় নেই, তা ঠিক। কিন্তু, তথ্যের আরেকটু গভীরে প্রবেশ করে সে সময়ের ঐতিহাসিক নথি ঘেঁটে দেখতে পাই, রঘুনাথ ঘোষের দস্যুবৃত্তির সময়কাল ১৮৫৯ থেকে ১৮৮০ অবধি (গ্রেপ্তারির খবর নেই), যার মধ্যে একাধিক বড়ো ডাকাতি ঘটেছে খোদ হাওড়া জেলায় (১৮৭৭ সালের জমিদার বাড়ির ডাকাতি, নীল বিদ্রোহের কিংবদন্তি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য)। 
দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ আমলের বর্ধমান রাজার জমিদারির কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটির ফলে ওই ১৮৬০ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে পাঁচলার ১০ কিলোমিটার ব্যাসের মধ্যে একাধিক ঘোষ পদবির উল্লেখও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, সে সময়ের জঙ্গলাকীর্ণ পাঁচলা, ডোমজুড় (পাঁচলা থেকে ৬ কিমি), বা পাঁচলায় আরও পরে গড়ে ওঠা সাহাপুর (১৯৩২ সালের গেজেটে নাম পাওয়া যায়), রঘুদেবপুর ইত্যাদি কিন্তু তখনও একেবারে আলাদা এক-একটি বসতি হয়ে ওঠেনি। সবটাই তখন জল-জঙ্গল-জমিন। মাঝে ছোটো ছোটো গ্রাম, একথা মনে রাখা প্রয়োজন। শান্তনুদা সাহাপুর গ্রামে তাদের পরিবারের বসতিস্থাপন প্রসঙ্গেও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন, ‘আমরা ডোমজুড় থেকে পাঁচলায় এসেছি দেড়শো বছর হল।’ অর্থাৎ ওই মোটামুটি ১৮৬০ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। কাজেই নথিবদ্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তা পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে।
কাজেই যা দাঁড়াচ্ছে তা হল এই— রঘুনাথ ঘোষ এবং তাঁর দলবলের দৌরাত্ম্য, ব্রিটিশ ও ব্রিটিশ তেলানো জমিদারদের বিরুদ্ধে তাঁদের লড়াই এই সময়টুকুর মধ্যে হাওড়ার পাঁচলা অঞ্চলে স্বয়ংসিদ্ধ ছিল; নাহলে হাওড়ায় আর এই নির্দিষ্ট থানার প্রয়োজন পড়বে কেন? তাঁর দলবলের প্রায় সকলেই কালীভক্ত ছিলেন। সকলেই ডাকাতকালী পুজো করতেন বা কোনো না কোনো পুজোর অংশীদার ছিলেন। এমনকি সেই সময়ে এই এলাকার অনেক গ্রামকেই ব্রিটিশরা ডাকাতের গ্রাম বলেই নথিবদ্ধ করেছিল। আর কথায় কথায় উঠে আসা শান্তনুদার সেই অমোঘ উক্তি, ‘গোটা সাহাপুর গ্রামটাই কালীভক্ত’ এবং ঐতিহাসিক নথিতে ১৮৬০ থেকে ১৯০০, এই চল্লিশ বছরের মধ্যে পাঁচলা থানার ৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে নানান প্রসঙ্গে একাধিক ঘোষ পদবির উল্লেখ খানিকটা রঘুনাথ ঘোষের দলবলের দিকেই আবছা এক ইঙ্গিত করে নাকি? 
এই সমস্ত তথ্য মিলিয়ে, এবং খানিকটা ‘উইশফুল থিংকিং’ ব্যবহার করে আমি যদি বলি- এই লুটকালী পুজো রঘুডাকাতেরই। তিনি না হলেও তাঁর দলেরই কারো পুজো। এবং রঘুদেবপুর নামটা খুব সম্ভবত সেই দলেরই কেউ ইংরেজ-বিদ্রোহী সর্দারের নামেই রখেছেন। সঙ্গে যোগ করেছেন দেবত্ব অর্থে ‘দেব’। এই অনুমান কি নিতান্তই অযৌক্তিক হবে? তথ্য ভিত্তিক প্রমাণ এই মুহূর্তে আমার হাতে নেই ঠিকই, তবে যা আছে তা হল...
বারংবার নানান খুটিনাটি প্রসঙ্গে আরও হাজারো প্রশ্নের মুখে শান্তনুদা জানিয়েছেন, ‘আমার শ্বশুরবাড়ি রঘুদেবপুরে। তোমার প্রশ্নের বিষয়ে নানান কথায় আমার স্ত্রী জানাল যে, ওর দাদু বলতেন রঘুডাকাতের নাম থেকেই নাকি রঘুদেবপুর নামটা এসেছে। দাদু একশো বছরেরও বেশি বেঁচে ছিলেন, এবং তিনি নাকি বারবার বলতেন যে রঘুনাথ ঘোষের দলের লোকজন, যারা এখানে থাকত তারাই নামটা দেয়।’ রঘুনাথ থেকে রঘু-সর্দার হয়ে তাঁর দলের হাত ধরে এক প্রত্যন্ত গ্রামের নাম রঘুদেবপুর হয়ে ওঠা কিন্তু ব্রিটিশ-বাংলার ইতিহাসের আলোকে খুব অযৌক্তিক কিছু নয়। হ্যাঁ, এই কথার নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনই পাওয়া মুশকিল, সেটা অনস্বীকার্য।
প্রখ্যাত গায়ক কিশোর কুমারের দাদা অশোক কুমার গাঙ্গুলিও নিজের মুখে স্বীকার করেছেন রঘুডাকাতের সঙ্গে জ্ঞাতিগত সম্পর্কের কথা। সেকথাটা এই প্রসঙ্গে স্মরণে আনা যেতে পারে। এ কি শুধুই এক অলীক সমাপতন? তাই শান্তনুদার কথাটা শোনা ইস্তক আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা রক্তের স্রোত তরতর করে মাথার দিকে ছুটে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, তবে কী সত্যিই পেয়ে গেলাম? এখনও সঠিক জানা নেই। কিন্তু, যতিদন না হাতেনাতে নথিভিত্তিক প্রমাণ পাচ্ছি ততিদন অবধি ‘নীলকর বিদ্রোহী বাংলার কিংবদন্তি রঘুডাকাত বা তাঁর দলবল অথবা জ্ঞাতি’ হয়তো আমার কাছের মানুষেরই পূর্বপুরুষ; এহেন সম্ভাবনার সৌভাগ্যটুকুও কটা মানুষের হয় বলুন তো?