Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শ্রাবণ পূর্ণিমায় রবিনির্বাণ

বৈশাখে এসে শ্রাবণ পূর্ণিমায় বিদায় নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।১৯৪১ সালের মতো এই বছরেও রবিনির্বাণ দিবসে সংযুক্ত হয়ে পড়েছে রবীন্দ্রনাথের সেই প্রিয় তিথি।

শ্রাবণ পূর্ণিমায় রবিনির্বাণ
  • ৭ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সায়ন্তন মজুমদার: বৈশাখে এসে শ্রাবণ পূর্ণিমায় বিদায় নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।১৯৪১ সালের মতো এই বছরেও রবিনির্বাণ দিবসে সংযুক্ত হয়ে পড়েছে রবীন্দ্রনাথের সেই প্রিয় তিথি।

Advertisement

আজ থেকে একশো বছর আগে প্রকাশিত ‘শেষ বর্ষণ’নাটকে কবি বসন্ত পূর্ণিমার সঙ্গে তুলনায় শ্রাবণ পূর্ণিমাকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেছিলেন। কারণ হাসির কানায় কানায় ভরা নয়নের জল আনা যায় একমাত্র ‘আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে’-ই। যা রাখি পূর্ণিমা নামেই বেশি প্রসিদ্ধ। চুরাশি বছর আগে বঙ্গজীবনে এসেছিল আমাদের হৃদয়নিংড়ানো সেই দিন। কবিপুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর কথায় সেদিন ছিল তাঁর বাবামশাই অর্থাৎ আমাদের বিশ্বকবির মহানির্বাণের সঙ্গে রাখিবন্ধন লগ্নের যোগ।
১৯০৫ সালের অক্টোবরে দুই বঙ্গের সকল মানুষকে বেঁধে রাখার জন্য রবীন্দ্রনাথ চালু করেন এক অকাল রাখিবন্ধন। সেই দিন তাঁর কাছ থেকে রাখিসহ আমন্ত্রণপত্র পান ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার, শিবনাথ শাস্ত্রীর মতো মনীষীরা। শিবনাথবাবু সেই রাখি সাদরে নিজের হাতে বেঁধে কবিকে চিঠি লেখেন। নিমন্ত্রণপত্রে যামিনীপ্রকাশ গঙ্গোপাধ্যায়ের আঁকা ছবিতে থাকা গোলাকার সূর্যের মধ্যে সম্ভবত রবিপ্রতিকৃতি অঙ্কিত ছিল। নীচে লেখা ছিল কবিরই লেখা একটি গানের কলি যা এখনও পর্যন্ত প্রতিবেশী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। আমন্ত্রণপত্রের অন্যদিকে হলুদ পাতায় লাল কালিতে ছাপা হয় বঙ্গভঙ্গবিরোধের আবহে লেখা রাখিসঙ্গীত। সেই গান আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সংগীতে পরিণত হয়েছে। সে গানের মাধ্যমে তিনি বাংলার মাটি-জল-হাওয়া-ফলকে পুণ্য করেছেন, বাংলার ঘর-হাট-বন-মাঠকে পূর্ণ করেছেন। তা দিয়ে আজও বাঙালির পণ-আশা-কাজ-ভাষা সত্য হয় ও প্রাণমনসহ বাঙালি ঘরের ভাইবোনেরা এক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। গোটা বাঙালি জাতিকে ‘ভাই ভাই একঠাঁই/ভেদ নাই,ভেদ নাই’মন্ত্রে দীক্ষিত করেন ভানুসিংহই। কলকাতার রাস্তায় সেই গানে মুখরিত জনতা গঙ্গাস্নান সেরে পরস্পরের হাতে তাঁর কথামতো হলুদ সুতোর রাখি বাঁধেন।
চার বছর পরে ১৯০৯ সালে শান্তিনিকেতনেও তিনি রাখিবন্ধন পালনের সম্মতি দিয়ে দেন। দিনটিকে ভারতমিলনের সুপ্রভাতরূপে বড়দিনে পরিণত করতে বলেন; যাতে সেই দিনে বুদ্ধ, খ্রিস্ট, মহানবী সম্মিলিত হতে পারেন। শিষ্য অজিতকুমার চক্রবর্তীকে চিঠিতে জানান যে, রাখিতে আত্মপর, শত্রুমিত্র, স্বজাতি-বিজাতি সকলকেই বাঁধে; সেই রাখি শান্তিনিকেতনের রাখি। তাঁর উপলব্ধিই যথার্থ। ইতিহাস মুঘলসম্রাট হুমায়ুনকে রাজপুতানিয়া রানি কর্ণাবতীর রাখি পাঠানোর কথা বলে। পুরাকালে শ্রীকৃষ্ণের হাতে দ্রৌপদীর কাপড়বাঁধা থেকেই নাকি রাখির উৎপত্তি। শ্রীকৃষ্ণ হস্তিনাপুর রাজসভায় অপমানিত দ্রৌপদীকে তা ফিরিয়ে দিয়ে তাঁর মান রক্ষা করেছিলেন। যাই হোক, রাখির সারকথাটাই হল রক্ষা করা। উৎসবে মত্ত ও মজে যাওয়া জনতা কি সে কথা মনে রাখে? আবার এই রাখি যেন বাংলা সাহিত্যের এই আদিত্যের সঙ্গে তাঁর উত্তরসূরিদেরও বেঁধে দিয়েছিল। বঙ্গভঙ্গকালে মহানগরীতে যখন রাখিবন্ধন উদযাপিত হচ্ছিল তখন দুশো কিমিরও বেশি দূরে বাংলার নবাবি জেলা মুর্শিদাবাদের জেমো গ্রামের ঘরে ঘরে পালিত হয়েছিল অরন্ধন। ত্রিবেদীদের নাটমন্দিরে পাঠ করা হয় ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা’। তাতে যুক্ত থাকা রবিলিখিত রাখিসঙ্গীত গীত হয়। ব্রতকথাটির রচয়িতা রবীন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গ, বিখ্যাত শিক্ষাবিদ-প্রাবন্ধিক রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।
১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় অন্নদাশঙ্কর রায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখী’। নবীন কবি সেটি শান্তিনিকেতনে মহাকবির হাতে দিতে যান। মস্করা করে প্রশাসক অন্নদাশঙ্করকে রাখির নামচুরিতে অভিযুক্ত করেন গুরুদেব। ওটি নাকি নিজের বইয়ের জন্য ভেবে রাখা নাম ছিল তাঁর। তবে আগেই এই নামে একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল রায়বাবুর কর্মস্থল বহরমপুর থেকে।‘রাখী’ নামের সেই বিস্মৃত কাব্যটি অন্নদাশঙ্করবাবুর বহরমপুরে আসার কয়েক বছর আগে ১৩৩০ বঙ্গাব্দে লিখেছিলেন মণিমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। বইটির আখ্যাপত্রে ‘রাখী’ শব্দ থাকা রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কলি মুদ্রিত ছিল। নানাভাবে রাখির প্রতি রবীন্দ্রনাথের ভালোবাসার কথা স্বতঃপ্রমাণিত। শতবর্ষের দোরগোড়ায় থাকা বিখ্যাত ‘রক্তকরবী’নাটকের বিশু পাগল, রঞ্জনের রক্তরেখায় নন্দিনী-রঞ্জনের পরমমিলনের রক্তরাখিকে দেখতে পেয়েছিল। তাই নিজের মৃত্যুর মাধ্যমে জগতের সঙ্গে তাঁর আপাত চিরবিচ্ছেদের কথা ভেবে নিশ্চিতরূপেই তিনি কাতর হননি। চোখে ঘোর ঘনিয়ে আসলেও গায়ে হয়তো তার পুলক লেগেছিল।‘প্রভু, আজি তোমার দক্ষিণ হাত’গানে তিনি তাঁর জীবনদেবতার ডান হাতে রাখি পরাতে চেয়েছিলেন। রাখিবাঁধার মাধ্যমে ভেদাভেদ ভুলে চেয়েছিলেন সকলের সঙ্গে বাঁধা পড়তে। তাই ২২ শ্রাবণ হয়তো কবিহৃদয়ে ‘রাঙা রাখীর ডোর’ বেঁধে দিয়ে জীবনদেবতা তাঁর সেই ইচ্ছাই পূর্ণ করেন। 
রবি কি এমন দিনেই তাঁর বিদায় প্রত্যাশা করেছিলেন? ১৮৯৩ সালে বত্রিশ বছর বয়সে একটি কবিতায় তিনি লিখেছিলেন,‘আমি পরানের সাথে খেলিব আজিকে/ মরণখেলা/ নিশীথবেলা।’কাব্য ‘সোনার তরী’-র সেই কবিতাটির নাম আমাদের সকলেরই জানা— ‘ঝুলন’। ঝুলনপূর্ণিমাও পালিত হয় রাখিপূর্ণিমার দিনে। মরণদোলার রশি ধরে কবি আর কী করবেন তাও লেখা আছে কবিতায়— ‘আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে/ ঝুলনখেলা/ নিশীথবেলা।’দিন ঠিক থাকলেও ক্ষণের দিক থেকে কিন্তু সূর্য যখন প্রায় মধ্যগগনে, ঠিক তখনই বাঙালির রবি অস্তমিত হন।
ঘনঘোর শ্রাবণের সেই দিনে বৃষ্টি হয়েছিল কি না তা জানা যায় চিত্রিতা দেবীর কথায়। ‘সেদিন ছিল কখনো রোদ, কখনো ঝিরঝিরে বৃষ্টি। মহাভারতীয় ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর দিনের মতো না হলেও তবু তা যেন আলংকারিকতার পুষ্পবৃষ্টি’তো বটেই।‘ঝুলন’কবিতার মতোই সেদিন বাংলার আকাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন, চারিধারে চোখের জলের বর্ষা নেমেছে। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের উত্তরসাধক বুদ্ধদেব বসু কবির পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছেন। ঠাকুরের মৃত্যুদিনটিকে বুদ্ধদেব অবিনশ্বর করে দিয়েছিলেন তাঁর ‘তিথিডোর’উপন্যাসে। নায়িকা স্বাতী সত্যেনের পাশে দাঁড়িয়ে মহাযাত্রায় রবিচ্ছবি দেখে চোখের জল ফেলেছে। ঔপন্যাসিক প্রশ্ন করেছেন, সেই মৃত্যু কান্না চেয়েছে কি? আশি বছরের মহাজীবনের পরম পরিশ্রমের শেষে সবশেষের রত্ন কি চোখের জলে ভাসিয়ে দেওয়া উচিত? 
বৈশাখে আবির্ভূত ও শ্রাবণে তিরোহিত কবি প্রসঙ্গে জ্যৈষ্ঠের ঝড় তথা বিদ্রোহী কবি নজরুল সম্ভবত সবার আগে কবিতা লিখেছিলেন। কলকাতা বেতার কেন্দ্র হতে সম্প্রচারের সময় নজরুল বিয়োগবেদনায় সম্পূর্ণ কবিতাটি আবৃত্তি করতে পারেননি। সেই ‘রবি-হারা’সৃষ্টিতে ছিল—কৃষ্ণা-তিথির অঞ্চলে মুখ লুকায়েছে আজ চাঁদে!/ শ্রাবণ মেঘের আড়াল টানিয়া গগনে কাঁদিছে রবি,/ ঘরে ঘরে কাঁদে নরনারী,‘ফিরে এসো আমাদের কবি!’ সেই দিন অবশ্য পূর্ণিমাযোগ থাকায় কৃষ্ণপক্ষের তিথি হওয়াটা সম্ভব ছিল না। বাঙালি জীবনের এক অন্ধকার দিন বোঝাতেই হয়তো নজরুল এই কথা লিখেছিলেন। কবিতায় পরে তিনি বলেছেন, সেদিন প্রাচ্যের কাব্যছন্দসুরের সরস্বতীর শ্মশানশিখায় চাঁদের জ্যোতির দহন হয়েছিল।
এদেশে বেঁচে থেকে সাহিত্যে রবীন্দ্রযুগের প্রবর্তক ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আবার তাঁর পরোক্ষ প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে জন্ম হয়েছিল রবীন্দ্রোত্তর যুগের। তাঁর লোকান্তরও যেন রবিনির্বাণ সাহিত্যের জন্ম দিয়েছিল। নিপাতনে সিদ্ধ, কঠোর সমালোচক সজনীকান্ত দাস সম্ভবত তাঁর ‘মর্ত্য হইতে বিদায়’নামে শোককবিতায় আমাদের শুনিয়েছেন সেই দিনের ‘ঝুলন-পৌর্ণমাসী রজনীতে সঘন শঙ্খরব’এবং সেই বনস্পতির মহাপ্রয়াণ বিষয়ে তিনি আমাদের জানিয়েছেন,‘প্রভাত হইল রাখী-পূর্ণিমা-দিন,/ মাটির ধরণী রাখিতে নারিল তবু/ বিদায়প্রার্থী বিবাগী সন্তানেরে।’
বাংলা সাহিত্যের প্রথম যথার্থ জীবনীনাটক লিখেছিলেন বনফুল বা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। সেই ‘শ্রীমধুসূদন’বইটি পড়ে একদা ‘বনফুল’ নামের কাব্যকার রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন তাঁকে নিয়েও জীবনীনাট্য লিখুন নাট্যকার বনফুল। জীবদ্দশায় তা না হলেও রবিবিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি লিখেছিলেন ‘অন্তরীক্ষে’নাটকটি। নাটকের প্রথমেই মহাকাশ থেকে মকর রাশির পূর্ণিমার চাঁদ ও শ্রাবণের মেঘে ঢাকা পৃথিবী দর্শন করেছিলেন গ্রিক দেবী এথেনা। নাটকের শেষে দেখা যায়,প্রয়াণের পরেই সাতঘোড়ার রথে রবীন্দ্রনাথ অন্তরীক্ষে অবতীর্ণ হন। গ্রিক দেবতা অ্যাপোলো তাঁর মাথায় লরেলমুকুট পরিয়ে সভাপতি পদে বরণ করে নেন।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে সম্ভবত সব থেকে দীর্ঘ শোককবিতাটি লিখেছিলেন বেনজীর আহমদ। ১৮৪ লাইনের ‘রবীন্দ্র প্রয়াণে’নামের কবিতাটিতে তিনি সম্রাট কবি বলে সম্বোধন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। আশ্চর্যের বিষয় পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের বেতারে রবীন্দ্রসংগীত বন্ধের বিবৃতিতে তিনিই সমর্থনসূচক স্বাক্ষর করেছিলেন। যাই হোক, বিদেহী কবিকে তিনি বলেছিলেন, ‘সেই তুমি নাই—/বঞ্চিত জাতির আজি সে ব্যথার নাহি নাহি ঠাঁই।/ সেদিন আকাশ পথে মেঘ চূড় শ্রাবণ-পূর্ণিমা/ জ্যোতির জোয়ার সনে বাদলের বেদনা অসীমা’। সেই চরম বিষাদের দিনে দুঃখবাদী কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের কলম ‘২২এ শ্রাবণ, ১৩৪৮’কবিতা হয়েছিল সার্থক—‘মেঘ চাপা পূর্ণিমা,/...পূর্ণিমা ছাড়ল,/ কিন্তু প্রভাতের কপালে/ আজ আর সূর্য উঠল না।’সেই দিনেই ভারতভাস্কর চিরতরে ভারত এবং বিশ্বরবি মহাবিশ্বপানে মহাপ্রস্থান করেছিলেন ।
 লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ