নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: পুলিশের খাতায় তারা ‘প্রোক্লেমইড অফেন্ডার’ অর্থাৎ ঘোষিত অপরাধী। ২০২০ সালে ২ জানুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়েছিল। কিন্তু এখনও তাদের খোঁজ পায়নি পুলিশ। সেই জোড়া অপরাধীর একজনকে গত ৬ জানুয়ারি পিংলা ব্লক তৃণমূল সভাপতি শেখ সবেরাতির ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছিল। যা নিয়ে তোলপাড় পড়ে যায় জেলার রাজনৈতিক মহলে। শেখ সবেরাতির ছেলের বিয়েতে গোলাম মেহেন্দি নামে ওই অপরাধীর স্যুট পরিহিত ছবি প্রকাশ্যে এসেছিল।
উল্লেখ্য, পাঁশকুড়ায় তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কুরবান শা খুনের ঘটনায় ওই দুজনের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়েছিল। ২০২০ সালে ২ জানুয়ারি থেকে পুলিশ তাদের খোঁজ পাচ্ছে না। অথচ তাদেরই একজনের ছবি তৃণমূল নেতার ছেলের বিয়েতে দেখা যেতে কলকাতা সিটি সেশন কোর্ট পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপারের কাছ থেকে রিপোর্ট তলব করেছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রিপোর্ট দিয়েছেন পুলিশ সুপার মিতুনকুমার দে। দুই পাতার রিপোর্টে তিনি জানিয়েছেন, ‘ঘোষিত অপরাধী’ গোলাম মেহেন্দি ও শীতল মান্নাকে ধরার জন্য লাগাতার চেষ্টা চালাচ্ছে জেলা পুলিশ। তাদের বাগে পেতে ধারাবাহিক অভিযান, প্রযুক্তিগত নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্যের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি পিংলার ধনেশ্বরপুর গ্রামে শেখ সবেরাতির বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়েছিল। এনিয়ে পাঁশকুড়া থানায় জেনারেল ডায়েরি হয়েছে। ২০১৯ সালে ৭ অক্টোবর পাঁশকুড়া থানার মাইসোরা বাজারে খুন হন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কুরবান শা। তিনি পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি এবং দলের ব্লক কার্যকরী সভাপতি ছিলেন। সেই খুনের ঘটনায় আনিসুর রহমান সহ আটজন গ্রেপ্তার হয়। পাঁচ বছর জেলবন্দি থাকার পর ২০২৫ সালে তারা শর্ত সাপেক্ষে জামিন পায়। কিন্তু, দুই অভিযুক্ত পাঁশকুড়ার শ্যামবল্লভপুর গ্রামের বাসিন্দা গোলাম মেহেন্দি এবং রাজশহর গ্রামের শীতল মান্নাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ২০১৯ সালে ১৯ নভেম্বর তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। কিন্তু, সেই পরোয়ানা কার্যকর না হওয়ায় ২০২০ সালে ২ জানুয়ারি হুলিয়া জারি হয়। তাদের খোঁজ পেতে এলাকায় মাইকিং হয়। সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। তবু তারা ধরা পড়েনি।
খুনের মামলায় ঘোষিত অপরাধীর তৃণমূল নেতার ছেলের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিতির ছবি ভাইরাল হয়। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে সাংসদ, বিধায়ক থেকে পুলিশ অফিসাররাও উপস্থিত ছিলেন। এ নিয়ে আদালতে পিটিশন করেছিল কুরবান শা’র পরিবার। তার ভিত্তিতে পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপারের রিপোর্ট চেয়েছিল আদালত। ১৭ ফেব্রুয়ারি সেই রিপোর্ট আদালতে জমা পড়েছে। তাতে শীতল মান্না ও গোলাম মেহেন্দির খোঁজ পেতে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ লাগাতার চেষ্টা করছে বলে জানানো হয়েছে।
কুরবান শা’র দাদা আফজল শা বলেন, পলাতক দুই অভিযুক্ত দীঘায় হোটেল লিজে নিয়ে ব্যবসা করছে। তারা দীঘায় রয়েছে। দীঘা থেকে নিয়মিত পাঁশকুড়ার বাড়িতে যাতায়াত করে। এর আগে একাধিকবার তাদের অবস্থান সম্পর্কে লোকেশন সহ তথ্য পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া সত্ত্বেও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। এই দু’জনকে গ্রেপ্তার না করার নেপথ্যে কোনো রহস্য থাকতে পারে। এমনকী, ২০১৮ সালে দাসপুর থানার কিসমত কলোড়া গ্রামে একটি অপহরণের ঘটনায় শীতল মান্নার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হয়। সেই পরোয়ানা কার্যকর করতে না পারায় ২০২৩ সালে নভেম্বর মাসে পাঁশকুড়া থানার তৎকালীন আইসি আশিস মজুমদারকে ভৎর্সনা করে ঘাটাল আদালত হেফাজতে নিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর তিনি জামিন পেয়েছিলেন। তারপরও দুই পলাতক অভিযুক্তের খোঁজ পাচ্ছে না পুলিশ!