Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

কৃষ্ণপক্ষের নবমীতে শুরু হয় পুজো, মল্লারপুরে ৫০০ বছরের ঐতিহ্য

সে প্রায় পাঁচশো বছর আগের কথা। বাংলার নবাব তখন মুর্শিদকুলি খাঁ। সেই সময়ে মল্লারপুরের দক্ষিণগ্রামের বাবুপাড়ায় বসবাস করতেন আশারাম রায়।

কৃষ্ণপক্ষের নবমীতে শুরু হয় পুজো, মল্লারপুরে ৫০০ বছরের ঐতিহ্য
  • ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: সে প্রায় পাঁচশো বছর আগের কথা। বাংলার নবাব তখন মুর্শিদকুলি খাঁ। সেই সময়ে মল্লারপুরের দক্ষিণগ্রামের বাবুপাড়ায় বসবাস করতেন আশারাম রায়। তিনি ছিলেন স্থানীয় জমিদার। মুর্শিদকুলি খাঁয়ের থেকে তিনি রায় ও পরে বাবু উপাধি পিয়েছিলেন। সেই বাবু আশারাম রায় বাবুপাড়ায় শুরু করেছিলেন দুর্গাপুজো। তখন এই পাড়ায় অন্য কোনও দুর্গাপুজো হতো না। তবে পাশের গ্রামে আশারামের কাকার প্রচলিত পুজো হতো। বাবুপাড়ায় মাটির তৈরি মন্দিরে একচালার প্রতিমা স্থাপন করে শুরু হয় পুজো। মন্দিরটি পরে পাকা হয়েছে কিন্তু এখনও একচালার প্রতিমাই পুজো হয়। শুধু একচালার প্রতিমাই নয়, পূর্বপুরুষের অনেক প্রাচীন প্রথাই এখনও মেনে চলা হয়। পুজোর পনেরা দিন আগে কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি থেকে মন্দিরে জ্বলে ওঠে সংকল্প প্রদীপ। দেওয়া হয় ছাগবলি। সেদিন থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজো। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের পর একটু একটু করে নিভে যেতে থাকে প্রদীপ। অপরাজিতার স্তোত্রপাঠের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পুজো। দেবীর ভোগে কচুর শাক দেওয়া হয়। পাঁঠার পাশাপাশি বলি দেওয়া হয় মোষ ও মেষ। এসব রীতিই শুরু হয়েছিল পাঁচশো বছর আগে। চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী পরিবারের বয়স্ক সদস্যর নামে পুজোর সংকল্প হয়। এবার ৮৬ বছরের মিহিরকুমার রায়ের নামে সংকল্প হবে। তাঁর ভাই স্বদেশরঞ্জন রায় বলেন, চিরাচরিত প্রথা মেনে বোধনের দিন একটি পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। এরপর প্রতিদিন পুজো ও ভোগ নিবেদন করা হয়। ষষ্ঠী থেকে মৃন্ময়ী মূর্তিকে পুজো নিবেদন করা হয়। সপ্তমীর দিন দেবীর সামনে তিনটি বলিদান হয়। সন্ধি পুজোয় একটি। নবমীর দিন চারটি পাঁঠা, একটি মোষ ও একটি মেষ বলি দেওয়া হয়। দেবীর অন্নভোগের অবশ্যই থাকে কচুর শাক। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত এলাকার মানুষকে পাত পেরে ভোগ খাওয়ানো হয়।  
অতীতে দশমীর দিন সকালে কুমারী পুজো ও সিঁদুর খেলা এবং পরে প্রতিমা কাঁধে করে গ্রাম প্রদক্ষিণ করিয়ে দিঘিতে নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে পুজোর সমাপ্তি হতো। এখন অবশ্য সেই রীতিতে বদল এসেছে। এখন দেবী মূর্তি ট্রাক্টরে চাপিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণের পর নিরঞ্জন করা হয়। এরপর একটু একটু করে নিভে যেতে থাকে সংকল্প প্রদীপ। রাতেই অপরাজিতার স্তোত্রপাঠের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পুজো। পরিবারের সদস্য কুমোদরঞ্জন রায়, পায়েল রায়রা বলেন, আগে পুজোয় বিলাসিতা, আড়ম্বর ছিল। নাচের আসর বসত। বিভিন্ন জায়গা থেকে জমিদাররা পুজোর সময় আসত। এখন সেসব অতীত। স্বদেশবাবু বলেন, এই পুজোরও আগে আশারাম রায়ের কাকা গোলাপ আচার্য গ্রামে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেছিলেন। তিনিও ‘রায়’ উপাধি পেয়েছিলেন। তখন পিতৃহারা আশারাম রায় ছিলেন নাবালক। সাবালক হওয়ার পর পৃথক হয়ে যাওয়ায় পুজোও ভাগ হয়ে যায়। তখন থেকেই গ্রামে রায়বাড়ির দু’টি পুজো হয়। একটি রায়বাড়ির, অন্যটি বাবুপাড়ার রায়বাড়ির পুজো। দু’টি পুজোয় একসঙ্গে ঘট ভরা থেকে বিসর্জন হয়। গ্রামের প্রবীণ মানুষেরা বলেন, জাঁকজমক কমলেও দু’টি পুজোর নিষ্ঠার কোনও পরিবর্তন হয়নি। ঐতিহ্য ও আভিজাত্যে আজও উজ্বল দক্ষিণগ্রামের এই দুই পুজো।

Advertisement

-------- মৃন্ময়ী। বাকি আর কয়েকটা দিন। কুমোরটুলিতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে কাজ। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ