Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

জনপ্রতিনিধিত্ব মানে জাহিরনামা নয়

শনিবার সকাল। মুম্বইয়ের শিবাজি পার্ক শ্মশানঘাট থেকে ধোঁয়া উঠছে আকাশপথে। বিজ্ঞাপন জগতের আইকন পীযূষ পান্ডেকে শেষ বিদায় দিতে জড়ো হয়েছে চেনা-অচেনা বহু মুখ। ঘিরে রয়েছেন বোনেরা, পরিবারের অন্য সব সদস্য, ইলা অরুণ, ছাত্রছাত্রী, সহকর্মীরা। গুনগুন করছেন তাঁরা একটি গান... ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’।

জনপ্রতিনিধিত্ব মানে জাহিরনামা নয়
  • ২৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: শনিবার সকাল। মুম্বইয়ের শিবাজি পার্ক শ্মশানঘাট থেকে ধোঁয়া উঠছে আকাশপথে। বিজ্ঞাপন জগতের আইকন পীযূষ পান্ডেকে শেষ বিদায় দিতে জড়ো হয়েছে চেনা-অচেনা বহু মুখ। ঘিরে রয়েছেন বোনেরা, পরিবারের অন্য সব সদস্য, ইলা অরুণ, ছাত্রছাত্রী, সহকর্মীরা। গুনগুন করছেন তাঁরা একটি গান... ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’। পীযূষ পান্ডের লেখা এই গান গত চার দশক ধরে বেঁধে এসেছে গোটা দেশকে। ১৪টি ভাষা, একের পর এক চোখ জুড়ানো লোকেশন, ঐতিহ্য এবং একটিই নাম—ভারত। রাজীব গান্ধী চেয়েছিলেন এমনই কিছু। বিবিধের মাঝে মহান এই দেশ... তাকে একেবারে অন্য মোড়কে তুলে ধরা দেশবাসীর সামনে। প্রত্যেক নাগরিক যেন নিজেকে কানেক্ট করতে পারে। দিল্লি হোক, কলকাতা, মুম্বই, আগরতলা বা কুর্নুল... প্রত্যেকের ভাষা ও সংস্কৃতির সমান গুরুত্ব। লালকেল্লায় তাঁর ভাষণের পর সম্প্রচার হবে দূরদর্শনে। সেই সময় টিভি বলতে ছিল এই একটিই মাধ্যম। সালটা যে ১৯৮৮। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন পীযূষ পান্ডে। আজ তিনি আবার ট্রেন্ডিং। তাঁর সেই ‘মিলে সুর’ও। কারণ? আরও একটি গান। এবারও প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে। কিন্তু গানের বোল? ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’। আজকের যুগের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা গলা মেলাচ্ছেন, হাত মুঠো করে আকাশে ছুড়ছেন, আর গাইছেন ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’। এও এক অভিজ্ঞতা বটে। গণসংগীত শুনেছি আমরা। কিন্তু এ পুরোদস্তুর রাজনৈতিক অ্যানথেম। ব্যক্তিসংগীত। দেশ নয়, ব্যক্তি আগে—এটাই আজকের ভারতের নয়া স্লোগান। কিন্তু প্রশ্ন হল, ভারত কি এই ব্যক্তিসংগীতে আপ্লুত? আশার কথা হল, পরিসংখ্যান সে কথা বলছে না। কারণ, এই গান ইউটিউবে রিলিজ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এর ‘ডিজলাইকে’র সংখ্যা ‘লাইক’ ছাপিয়ে গিয়েছে। লাইক যখন ছিল ৪৬ হাজার ৯৭৬, ডিজলাইক তখনই ৪ লক্ষ ৭ হাজার ৬১১টি। মানুষ যে এই জাহিরনামা পছন্দ করেনি, সেটা বোঝার জন্য আইনস্টাইন হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, ভারতবাসী প্রতিশ্রুতি এবং ‘মুমকিন’-এর বহর বুঝে নিয়েছে। ১১টা বছর তার জন্য কম সময় নয়! রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস মানুষের আস্থা অর্জনের মতো আর একটু কাঠখড় পোড়াতে পারলে গত বছর লোকসভা ভোটের ফলও হয়তো অন্যরকম হতো। প্রশ্ন হল, প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসের পাহাড়ের উচ্চতা কতটা জরিপ করতে পেরেছে মানুষ? 

Advertisement

সাধারণ মনস্তত্ত্ব হল, ‘কী পেয়েছি’ সেটা উলটোদিক থেকে মানুষ শুনতে চায় না। অর্থাৎ কেউ যদি বলে, ‘ওহে, তোমাকে আমি বাড়ি তৈরির জন্য লোনের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। তোমার বাড়িতে জল আসত না, পাইপলাইন বানিয়ে দিয়েছি। তুমি খেতে পেতে না, ফ্রিতে চাল দিয়ে যাচ্ছি।’... কেউ সেটা ভালোভাবে নেয় না। হয়তো সবটাই ঠিক। কিন্তু তারপরও মনে মনে বলে, করেছ তো জাহির করার কী আছে? এটাই যদি ব্যক্তি থেকে সরকার বা নির্বাচিত প্রতিনিধির দিকে ঘুরে যায়, তাহলে এই ‘মনে করা’ ব্যাপারটাও আর আসে না। তখন ভোটার মনে করে, এই সব তোমারই দায়িত্ব। তোমাকে ভোট দিয়ে পাঠিয়েছি, এগুলো করাটাই তোমার কর্তব্য। অর্থাৎ, মানুষের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান নিশ্চিত করা, রাস্তাঘাট বা পানীয় জলের লাইন, চাকরির ব্যবস্থা, জিনিসপত্রের দাম কমানো... প্রত্যেকটি পরিষেবা দেওয়ার জন্যই সরকার রয়েছে। এবং অবশ্যই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা। এই কাজ একজন জনপ্রতিনিধি করছে, কিংবা করছে না। এর বাইরে তৃতীয় কোনও অপশন হতে পারে না। কিন্তু তিনি যখন জনসমক্ষে সেই সব কাজকর্মের ফিরিস্তি দেন, সাধারণ মানুষ কিন্তু তার সবকটাই নিজের জীবনের সঙ্গে মেলাতে শুরু করে। সে হিসেব কষে, এই যে লোকটা এত কথা বলছে, এর মধ্যে সত্যিই কোনটা কোনটা পেয়েছি। বলছেন রোজগার মেলায় ১০ লক্ষ চাকরি হয়েছে, তাহলে আমার ছেলেটা মাস্টার ডিগ্রি করেও ঘরে বসে কেন? প্রতিদিন হন্যে হয়ে দোরে দোরে ঘুরেও কেন একটা চাকরি জুটছে না তার? কেন সরকারি দপ্তরে এত পদ খালি পড়ে আছে? এই যে উনি বলছেন জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের আয়ত্তের মধ্যে এসে গিয়েছে। তাহলে কেন অফিস থেকে ফেরার সময় বাজারে ঢোকার আগে দেখে নিতে হয় পকেটে কত টাকা আছে? তিন-চার বছর আগেও যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার হয়ে যেত, এখন কেন তা দিয়ে দু’দিনের রেস্ত জোগাড় হয় না? স্পেস টেকনোলজি দিয়ে নাকি রাস্তা তৈরি হচ্ছে! কোটি কোটি টাকা খরচের পরও কেন তাহলে ওই রাস্তাতেই এক মানুষ গর্ত? আমরা কি রোড ট্যাক্স দিই না? মানুষ হিসেব মিলিয়ে চলেছে... নিরন্তর। তাই ‘কী করেছি’ তা ফলাও করে বলাটা কোনও কাজের কথা নয়। লোকে বাতেলাবাজ বলবে। বরং কী এখনও করতে পারিনি, কোন কোন কাজ করা বাকি আছে... মানুষ এটা শুনতে চায়। সেটাও আজ। এখন। ২৫ বছর পরের গল্প নয়। অতদিন কে বাঁচবে তার ঠিক আছে? নাকি কার সরকার তখন রাজত্ব করবে, তার হদিশ? কোনওটাই নেই। যা করার আজই করতে হবে। পরিকাঠামো উন্নয়ন, কারখানা, উৎপাদন বৃদ্ধি, চাকরি, মূল্যবৃদ্ধির নিয়ন্ত্রণ... সেই ব্যাখ্যা কেন আসে না ভাষণে? 
রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী মেটেরিয়াল ছিলেন কি না, সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। কিন্তু তিনি যে পলিটিশিয়ান ছিলেন না, সেটা নিশ্চিত। মা ইন্দিরা গান্ধীর মর্মান্তিক মৃত্যু তাঁকে ওই কুর্সিতে অক্লেশে বসার সুযোগ করে দিয়েছিল। মিসঅ্যাডভেঞ্চারের কমতি ছিল না তাঁর স্বল্প পরিসরের রাজনৈতিক কেরিয়ারে। তবু বলা যায়, তিনি চেষ্টা করেছিলেন। এই দেশের জন্য। প্রযুক্তি এগিয়ে নিয়ে যাবে ভারতকে—এই স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন। ১৯৮৪ শিখ বিরোধী দাঙ্গা দেশের মাটিতে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতাকে যেভাবে সার-জল দিয়েছিল, তার সমূলে বিনাশ চেয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালে লালকেল্লায় দাঁড়িয়ে রাজীব গান্ধী বলেছিলেন, ‘আমাদের যেমন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়তে হবে, তেমনই মোকাবিলা করতে হবে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার। আমাদের দেশ এগোবে, বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। কিন্তু এই সব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে। একসঙ্গে।’ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কী কী করেছেন... তার থেকেও বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি কোন কোন কাজ করতে হবে, তার উপর। কীভাবে দূর হবে গরিবি, কীভাবে আসবে কৃষিবিপ্লব, বাড়াতে হবে কল-কারখানা। তাহলেই বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ। রাজীব গান্ধী বলেছিলেন, এইসবই তাঁকে করতে হবে। দ্রুত। রাজীবও তো বিপুল জনমত নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। ওভার কনফিডেন্স দেখানো দোষের ছিল না। তাও তিনি দেখাননি। বলেননি, ২৫ বছর পর আমি অমুক করব, তমুক আনব। যে বছর লালকেল্লায় দাঁড়িয়ে আম জনতাকে জানিয়েছিলেন, তাঁর ‘কী কী করা বাকি’... তার পরের বছরই বিদায় নিতে হয়েছিল তাঁকে। শিক্ষা ছিল তাঁর অন্দরে, তাই বুঝেছিলেন কাজ করতে হবে। ধর্মের বেসাতি নয়। মানুষের পেটের ভাত নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষিত করতে হবে যুব প্রজন্মকে। কম্পিউটারে। টেলিফোনে। প্রযুক্তিতে। কারণ ওটাই ভবিষ্যৎ। আর এখন? সূর্যের দিকে পিছন ফিরে আমরা আলোর সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছি। বিহার ভোট তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। প্রত্যেকটা দল নিজের মতো করে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। নীতীশ কুমার প্রত্যেক মহিলাকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দিচ্ছেন, তো অযোধ্যায় রামমন্দিরের মতো সীতামারিতে মা সীতার মন্দির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। অন্যদিকে তেজস্বী যাদব দাবি করছেন, ভোটে জিতে এলে প্রত্যেক পরিবারের একজন সরকারি চাকরি পাবে। সঙ্গে মাসে মাসে টাকা তো রয়েইছে। কিন্তু তাতে কি বিহারে কোনও সংস্থা এসে নতুন প্রজেক্টে হাত দেবে? কারখানা হবে? কিংবা আইটি হাব? মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়বে? কোথা থেকে আসবে এই টাকা? এরপর জাতিগণনা আছে, তার জেরে মাথাচাড়া দেওয়া জাতপাতের রাজনীতি, বিভেদ, ধর্মের নামে অশান্তি, ভিটেমাটি ছেড়ে কাজের খোঁজে অন্যত্র চলে যাওয়া মানুষ... এটাই কি উন্নত বিহার? নাকি উন্নত ভারত? 
যে যার ভোটব্যাংক গোছাতে ব্যস্ত। কেউ ধর্মের নামে। কেউ চাকরি। ভোটব্যাংক হিসেবে না দেখে তাদের কি মানুষ হিসেবে ভাবা যায় না? শুধু এই দেশের নাগরিক হিসেবে? যার মানদণ্ড টাকা, ধর্ম বা সম্পত্তি... কিছুতেই হবে না। ফারাক হবে শুধু নজরের। ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’র প্রথম দৃশ্যে পণ্ডিত ভীমসেন যোশিকে দেখা গিয়েছিল একটি অপরূপ সুন্দর ঝরনার পাশে বসে সুর মেলাতে। কোদাইকানলের পাম্বার ফলস। সেই ঝরনা, যেখানে শ্যুটিং হয়েছিল বিখ্যাত লিরিল বিজ্ঞাপনের। পার্থক্য কোথায় হল? প্রেজেন্টেশনে। দেশকে আপনি কোন নজরে দেখবেন, সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। মানুষের অন্ন নিশ্চিত করবেন, নাকি ধর্মীয় ভাবাবেগে উসকানি দেবেন, সেটাও। স্বামী বিবেকানন্দ গোটা বিশ্বে সনাতনী ধর্মকে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু আরও একটা কথা বলেছিলেন তিনি... খালি পেটে ধর্ম হয় না। আগে ক্ষুধার্ত দেশবাসীর মুখে ভাত তুলে দিতে হবে। 
স্বামীজির কাছে দেশ মানে কিন্তু মানুষ। জাত নয়, ধর্ম নয়, বর্ণ নয়। বিবিধের মধ্যে ঐক্য। তবেই একের সঙ্গে অন্যের সুর মিলবে। ‘সা’টা ঠিকমতো লাগবে। মোদিরও লাগবে, মদনেরও। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ