Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

পড়শি ঝাড়খণ্ডে গিয়ে বিয়ের আয়োজন, লাফিয়ে বাড়ছে নাবালিকা প্রসূতি

পড়শি ঝাড়খণ্ডে গিয়ে বিয়ের আয়োজন, লাফিয়ে বাড়ছে নাবালিকা প্রসূতি
  • ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
সৌরভ বড়াল, সিউড়ি: বীরভূমে নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। এর পিছনে অনেক কারণ থাকলেও সম্প্রতি প্রশাসনের পর্যবেক্ষণে উঠে আসা একটি তথ্য রীতিমতো উদ্বেগজনক। তা হল, পুলিস-প্রশাসনের কড়া নজরদারি এড়াতে নাবালিকা মেয়েদের বিয়ের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ডে। অত্যন্ত সন্দর্পণে সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে চলে যাচ্ছেন বাড়ির লোকজন। পাত্রপক্ষেরও লোকেরাও চলে যাচ্ছেন। সেখানে আয়োজন করা হচ্ছে বিয়ের। তারপর কিছুদিন বাইরে কাটিয়ে জেলায় ফিরলে সেই বিয়ে আর ভাঙা যাচ্ছে না। নিরুপায় অবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছে জেলা প্রশাসনকে। এছাড়াও গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্রতা বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ বলেও মনে করছেন অনেকেই। 
Advertisement
জানা গিয়েছে, চলতি আর্থিক বছরের প্রথম আট মাসের পরিসংখ্যান বেশ উদ্বেগজনক। চিন্তিত জেলা প্রশাসন এবং জেলা স্বাস্থ্যদপ্তর। চিন্তা বাড়াচ্ছে প্রসূতি মা এবং শিশুমৃত্যুর হার বৃদ্ধিতেও। বাল্যবিবাহের জেরে নানা শারীরিক সমস্যায় পড়ছে মায়েরা। অপুষ্টি ও দৈহিক গঠনগত অপরিপূর্ণতার কারণেই মৃত্যুর হার বেশি বলে মত চিকিৎসক মহলের। বীরভূম স্বাস্থ্য জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক হিমাদ্রি আড়ি বলেন, মূলত বাল্যবিবাহের কারণে এই নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি, প্রসূতি মা এবং শিশুর মৃত্যুও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগের।
  বীরভূম স্বাস্থ্য জেলার ১১টি ব্লকে এমন করুণ ছবি সামনে আসায় নড়েচড়ে বসেছে জেলা প্রশাসন। কাঁটাছেঁড়া শুরু হয়েছে বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের উপর। ফাঁকফোকর কোথায় থেকে যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে, একটি বিষয়ে সকলেই প্রায় একমত, জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে দুঃস্থ পরিবারের আর্থিক অনটনই বাল্যবিবাহ রোখার ক্ষেত্রে মূল অন্তরায়। ইদানীং গ্রামাঞ্চলের ছোঁয়া লাগছে শহরাঞ্চলেও। সেটাও বেশ ভাবাচ্ছে প্রশাসনকে। স্বাস্থ্যজেলা সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি আর্থিক বছরের প্রথম আট মাসেই নাবালিকা প্রসুতির সংখ্যা চার হাজার ৬২ জন। অর্থাৎ, একই সংখ্যক বাল্যবিবাহ হয়েছে। এদিকে, শিশুসুরক্ষা দপ্তরের তরফে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এবছর মাত্র ১৭৮টি বাল্যবিবাহ রুখতে সক্ষম হয়েছে তারা। তার পরও প্রচুর সংখ্যক নাবালিকার বিয়ে হয়েছে। সংখ্যাটা প্রায় তিন হাজার ৮৮৪। এই নাবালিকাদের বিয়ে কেন রোখা গেল না? প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। 
ক’দিন আগে বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত বৈঠকে জেলাশাসক বিধান রায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, ‘বাল্যবিবাহ রুখতে আগামীদিনে একটি রোড ম্যাপ তৈরি করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই তথ্য গোপন করার কিছু নেই। বরং তথ্য গোপন না করে বাল্যবিবাহ কীভাবে বন্ধ করা যায়, সেই বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পরিকল্পনা নেওয়া আবশ্যক। 
বাল্যবিবাহ ও নাবালিকা প্রসূতি সমান্তরাল গতি নিয়ে চলে। অর্থাৎ, বেশি সংখ্যক বাল্যবিবাহ মানে নাবালিকা প্রসূতি মায়ের সংখ্যা বৃদ্ধি। আঠারোর আগে মা হওয়া মানেই হাজারো সমস্যা। এমনকী, মা ও শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সেটা হচ্ছেও বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। এনিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে  বাধ সাধছে ঝাড়খণ্ডে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়ার ধুরন্ধর কৌশল। জানা গিয়েছে, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাল্যবিবাহ প্রাথমিকভাবে রুখে দেওয়া হলেও কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিবেশি রাজ্যে চলে গিয়ে নাবালিকাদের বিবাহ দিচ্ছে অনেক পরিবার। সেখান থেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সেই প্রসূতি মা জেলায় ফিরছেন। তাতে সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।  মূলত ১৫ থেকে ১৯ বছরের মেয়েরা বাল্যবিবাহের কারণে অন্তঃসত্ত্বা হচ্ছেন। এমনকী ১৫ বছরের নিচেও অনেক মেয়ে প্রসূতি হয়ে হচ্ছেন। সবথেকে খারাপ অবস্থা মহম্মদ বাজার ব্লকের। সেখানে মোট প্রসূতি মায়ের সংখ্যা এক হাজার ৪৭৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৪৭৬ জন নাবালিকা। সব মিলিয়ে বীরভূম স্বাস্থ্য জেলায় মোট প্রসূতি মায়ের সংখ্যা ১৪ হাজার ৯২৭জন। তার মধ্যে ২৭ শতাংশ অর্থাৎ, চার হাজার ৬২ জন হলেন নাবালিকা প্রসূতি। 
সম্পর্কিত সংবাদ