Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভারতের মাথাব্যথা বাড়ল

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের ঝড় উঠেছে। এবার ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু নেপাল। সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নেপালে দেশজুড়ে হিংসা বিক্ষোভ শুরু হয়।

ভারতের মাথাব্যথা বাড়ল
  • ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের ঝড় উঠেছে। এবার ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু নেপাল। সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নেপালে দেশজুড়ে হিংসা বিক্ষোভ শুরু হয়। ‘জেন জি’-র বিক্ষোভের জেরে শেষপর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। অনেকের কাছে কাঠমাণ্ডুর ভয়াবহ সেই দৃশ্য ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কা কিংবা ২০২৪ সালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের পুনরাবৃত্তিকে মনে করিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশেই গণবিক্ষোভ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পতন এবং রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থার এক ধরনের মিল পাওয়া যায়। আশার কথা যে, নেপালে মিলেছে আপাতত একটা সমাধানসূত্র। আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেছেন সুশীলা কারকি। বলাবাহুল্য নেপালের সংকট ভারতের জন্য শুধু প্রতিবেশীর অস্থিরতা ছিল না, বরং কৌশলগত দুশ্চিন্তার কারণও। নেপাল ভারতের একেবারে ঘনিষ্ঠ দেশ। ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের বন্ধনে দুই দেশ নিবিড়ভাবে যুক্ত। নেপালের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত ১,৭৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই সীমান্ত পাঁচটি ভারতীয় রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। এসব সীমান্ত পুরোপুরি উন্মুক্ত। দুই দেশের মানুষ পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত। এমনকী গ্রামীণ স্তরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনও তাঁদের মধ্যে গভীর।

Advertisement

ভারতের জন্য নেপালের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর দিকে চীনের ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড নেপালের সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি। দক্ষিণে নেপালের ভৌগোলিক পথ দিয়েই সরাসরি ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতে প্রবেশ সম্ভব। তাই নেপাল শুধু প্রতিবেশী নয়, বরং ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত হিসাবের কেন্দ্রবিন্দু। তাছাড়া ভারতে বিপুলসংখ্যক নেপালি প্রবাসী রয়েছেন। সরকারি হিসেবে এই সংখ্যা ৩৫ লাখ। তাঁরা শ্রমবাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকী সেনাবাহিনী পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষ চুক্তির আওতায় নেপালের প্রায় ৩২ হাজার গোর্খা সেনা বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করছেন। নেপালের হিন্দু তীর্থস্থানও ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিনাথ মন্দিরসহ বহু পবিত্র স্থানে প্রতিবছর হাজার হাজার ভারতীয় তীর্থযাত্রী ভ্রমণ করেন। অর্থনৈতিক দিক থেকেও নেপাল ভারতের উপর অনেকটা নির্ভরশীল। ভারতের সঙ্গে বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার বেশিরভাগই নেপালের আমদানি— বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি। যদিও এখন কাঠমাণ্ডুতে কিছুটা শান্তি ফিরেছে, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে রয়েছে জনগণের গভীর ক্ষোভ। নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল— ওলির নেতৃত্বাধীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল), শের বাহাদুর দেউবার নেপালি কংগ্রেস, এবং পুষ্প কমল দাহালের (প্রচণ্ড) নেতৃত্বাধীন মাওবাদী কেন্দ্র— সব ক’টি দলের প্রতিই জনগণের আস্থা কমে গিয়েছে। অথচ, ভারতের সঙ্গে এই তিন দলেরই দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঙ্গীতা থাপলিয়াল বলেছেন, ‘ভারত চাইবে না নেপালে বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি তৈরি হোক। তাই তারা সংযত ও সতর্ক পদক্ষেপ নেবে।’ এখানে বাংলাদেশের প্রসঙ্গও উঠে আসে। দিল্লির সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। কিন্তু হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটা শীতল। কারণ দিল্লি হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে। ভারত-নেপালের সম্পর্কেও আগের টানাপোড়েন এখনও মীমাংসিত হয়নি। ২০১৯ সালে ভারত যে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছিল, সেখানে নেপালের দাবি করা কিছু ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নেপাল পাল্টা নিজস্ব মানচিত্র প্রকাশ করে। সম্প্রতি ভারত ও চীন নেপালের দাবি করা লিপুলেখ গিরিপথ ব্যবহার করে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর ঘোষণা করে। ওলি গত মাসে চীন সফরে গিয়ে এই বিষয়ে আপত্তি তুলেছিলেন।
এমন জটিল প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য করণীয় হল, একদিকে নেপালের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করা, অন্যদিকে তরুণ জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করা। কারণ, বিক্ষোভের মূল চালিকা শক্তি ছিল তরুণেরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত নেপালি শিক্ষার্থীদের জন্য ফেলোশিপ বাড়াতে পারে, কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারে, যাতে তরুণ প্রজন্ম ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক অনুভব করে। ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) কার্যত অচল হয়ে আছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। এখন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক টানাপোড়েনের। তাই নেপালের অস্থিরতা দিল্লির কূটনৈতিক বোঝা আরও বাড়াল। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অশোক মেহতা এই প্রেক্ষাপটে সতর্ক করে বলেছেন, ‘ভারত তার মহাশক্তি হওয়ার স্বপ্নে এতটাই মগ্ন যে, প্রতিবেশী দেশগুলির দিকে নজর দিতে ভুলে গিয়েছে। অথচ মহাশক্তি হওয়ার প্রথম শর্ত হল, নিরাপদ ও স্থিতিশীল প্রতিবেশী।’ নেপালের সাম্প্রতিক অস্থিরতা তাই শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় বিপদ। আর ভারতের জন্য বিশেষ কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। দিল্লিকে এখন একদিকে প্রতিবেশী নেপালের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ প্রশমিত করতে হবে। নইলে নেপালের মতো ছোট দেশেও ভারতের প্রভাব ক্ষয়ে যেতে পারে। আর সেটি হলে তা দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যে চীন কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ