


কলহার মুখোপাধ্যায়: রাতে বাড়ি ফেরার পথে বাইক মিছিল আসন্ন ঝড়ের মতো গোঁ গোঁ আওয়াজে আছড়ে পড়ে। বুক কেঁপে যায়। সকালের বাজারে সবজি-মাছ-মাংসের বিক্রেতা কম। কেনার লোকজনও কম। কাজে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে রাস্তায় বাস নেই। বেশিরভাগ দোকান বন্ধ বলে সন্ধ্যার পর রাস্তা খাপছাড়া অন্ধকারে মিশে আসন্ন ভবিষ্যতের মতো আবছায়ায় ঢাকা, রহস্যময়। বাপ-দাদারা বলেন, ভোটে পালাবদল বলে এরকমই আচ্ছন্ন করা আলো আঁধারি হয়। এসবের মধ্যেই সকাল হল। যেমন গতকাল হয়েছে। যেমন আগামী কাল হবে।
আজকের সকাল জানলা দিয়ে ঢুকল আলো হয়ে। কোনো কারণে রোদ্দুরের মুড আজ ভালো। সে আজ প্রখর, আরও উজ্জ্বল। যেন রবির কিরণে বিশ্বসংসারের অপার আনন্দঘন রূপ নতুনতর হয়ে উদ্ভাসিত হল ভোট পরবর্তী ৯ মে সকালে।
তবে আজ শুধু ৯ মে নয়, আজ ২৫ বৈশাখও।
এদিনই বাংলার আকাশে উদয় হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামে এক ব্যক্তির। মৃত্যুর ৮৫ বছর বাদেও যিনি বাঙালির ‘নিভৃত প্রাণের দেবতা’ হয়ে রয়ে গিয়েছেন। আলো আঁধারির ধোঁয়াশা কাটিয়ে মনে আলো আনার উপায় আমাদের শিখিয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথই। লিখছেন...
‘দেখিলাম, একটি অপরূপ মহিমায় বিশ্বসংসার সমাচ্ছন্ন, আনন্দে এবং সৌন্দর্যে সর্বত্রই তরঙ্গিত। আমার হৃদয় স্তরে যে একটা বিষাদের আচ্ছাদন ছিল তাহা এক নিমেষেই ভেদ করিয়া আমার সমস্ত ভিতরটাতে বিশ্বের আলোক একেবারে বিচ্ছুরিত হইয়া পড়িল...’ প্রসঙ্গত, অতঃপর ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি জন্ম নিল সদর স্ট্রিটে।
হৃদয়স্তরের বিষাদের আচ্ছাদন সরাতে জাদু মলমের সন্ধান দিয়ে গিয়েছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ, সে রবীন্দ্রনাথই ভবিষ্যতের আলো আঁধারির আবছায়া কাটানোর উপায়ও বাতলে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর সমাজের সবস্তরে অল্পবিস্তর পরিবর্তন আসে। এখন কোথাও বদলা হচ্ছে। আসন্ন বদলগুলিও অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে আসবে আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিসরে। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবসের দিন পালাবদলের অনুষ্ঠান অবশ্যই কাকতালীয়। কিন্তু কয়েকজনও যদি ভেবে নেন এ সমাপতন নিয়তি
নির্দিষ্ট। দোষ কি?
নিয়তি নির্দিষ্ট কারণ, নিভৃত প্রাণের দেবতার হাতেই ছিল বাংলাদেশের মনের আবছায়া কাটানোর ম্যাজিক পেন। যা দিয়ে নির্মল একটি দুনিয়ার অসংখ্য ল্যান্ডস্কেপ এঁকে গিয়েছিলেন। সে ছবির মতো দুনিয়া রবীন্দ্রনাথ পেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পাননি। সে দুনিয়া বাস্তবে হতে পারত, কিন্তু হয়নি। সে দুনিয়া স্বপ্নে ভাসে কিন্তু ঘুম ভাঙলে তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তবুও রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা সে দেশ বাঙালির অস্তিত্বে মিশে, স্বপ্নে বসে। সে দিনবদলের গল্প শোনায় রোজ, সবসময়।
সে দেশে যাওয়ার ইচ্ছে করে।
তবে সে দেশে যাওয়া সহজও নয়। সেখানে যেতে হলে রবি ঠাকুরের রাজনৈতিক ভাষ্যের গভীরতায় ডুব দিতে হয়। সে কাজও সহজ নয়।
শুধু মানবতাবাদী কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়লে তাঁর রাজনৈতিক গভীরতাকে পুরো বোঝা যায় না। তিনি এমন এক চিন্তার জগৎ তৈরি করেছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র, জাতি, ধর্ম, ক্ষমতা সব আছে। কিন্তু সবকিছুর উপরে আছে মানুষ, আছে মুক্ত বিবেক। সভ্যতার সংকটে রবি ঠাকুর লিখছেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ যখন ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ চরম পর্যায়। যুদ্ধ এবং ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বিস্ফোরণ ঘটছে। তখন পরাধীন এক দেশের এক প্রান্ত প্রদেশের কবি লিখছেন এ কথা। এ লেখা নিছক আশাবাদ ছিল না। বরং রাজনৈতিক নৈতিকতার ঘোষণা
ছিল। তিনি বুঝিয়েছিলেন, যখন রাজনীতি মানুষের ভয়,
ঘৃণা ও প্রতিশোধস্পৃহাকে ব্যবহার করে, তখন সভ্যতা টেঁকে না। উপর উপর তার আস্ফালন ঠিকই থাকে কিন্তু ভিতর থেকে যায় ভেঙে।
এতদিন পরও তাঁর এসব কথা বোধের জগতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেয়। এখন ধর্মীয় মেরুকরণ, দেশদ্রোহী বলে
তকমা দেগে দেওয়ার প্রবণতা, বিরোধী মতকে শত্রু
ভাবা, ইত্যাদির মধ্য দিয়ে চলছে সমাজ। এখন ভাবতে
বসতে হয়, এগুলির বিরুদ্ধে গিয়ে রবীন্দ্রনাথই মানুষের অন্তরের নৈতিক স্বাধীনতাকে রক্ষা করার কথা বলে গিয়েছিলেন, সেই কত আগে।
বের করে আনা যাক ‘ঘরে বাইরে’ বইটা। দেখা হোক সন্দীপের সঙ্গে। সন্দীপ উগ্র রাজনৈতিক আবেগের প্রতীক। তিনি মানুষের যুক্তি নয়, আবেগকে উসকে দেন। দেশপ্রেমকে এমন শক্তভাবে ব্যবহার করেন যে, সাধারণ মানুষ নৈতিক বিচারবোধ ফেলে হারিয়ে। তবে উপন্যাসে নিখিলেশের সঙ্গেও দেখা হয়। অমর উক্তিটি রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দিয়েই বলান, ‘দেশকে আমি সেবা করতে রাজি আছি, বন্দনা করতে নয়।’ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ বলে গেলেন, যখন দেশ বা দল পুজোর বস্তু হয়ে ওঠে তখন প্রশ্ন করার অধিকার হারিয়ে যায়। গণতন্ত্র বদলে গিয়ে পরিণত হয় আনুগত্যের সংস্কৃতিতে। তিনি তাঁর অজস্র বক্তৃতায় পাশ্চাত্যের আগ্রাসী জাতীয়তাবাদকে ‘সংগঠিত স্বার্থপরতা’ বলে দেখিয়েছিলেন। এবং স্বাধীনতাপূর্ব সময় দাঁড়িয়ে ভীত ছিলেন যে, ভারত যদি একই পথ নেয়, তবে দেশের স্বাধীনতাও মানুষের মুক্তি আনবে না। তাঁর কাছে স্বাধীনতা মানে শুধু বিদেশি শাসকের পতন নয়, মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা। তারপরই লেখা, ‘পেট্রিয়টিজম ক্যান নট বি আওয়ার ফাইনাল স্পিরিচুয়াল শেল্টার।’ দেশপ্রেম কখনোই আমাদের আত্মার পরিপূর্ণ আশ্রয় হতে পারে না।
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় যখন মানুষকে মানুষের থেকে আলাদা করছে। তখন এই কথাগুলিকেই আশ্রয় করতে হয়। মনের ধোঁয়াশা কাটাতে আজ আরও একবার বসা হবে নাকি রবি ঠাকুরের বইগুলির সঙ্গে? বসলে দেখা যাবে, সংকীর্ণতা শুধুই ধর্মীয় হয় এমন নয়, তা রাজনৈতিক দলদাসত্বেরও অংশও। চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির... রবীন্দ্রনাথের চিত্ত যে স্বপ্ন দেখায়, তা ধর্মীয়, দলদাসত্বের না, তা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন। যেখানে মানুষ প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি দিতে পারে, এবং সংকীর্ণতার বিস্তীর্ণ ধুলোরাশি পেরিয়ে এগিয়ে যেতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হল, তিনি কোনো পক্ষেরই অন্ধ সমর্থক ছিলেন না। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করেছেন। ভারতীয় উগ্র জাতীয়তাবাদকে প্রশ্ন করেছেন। তাঁর কাছে রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য ক্ষমতা দখল নয়, তা হচ্ছে মানুষের মর্যাদা রক্ষা। আজকের সময় তাঁর লেখাই শেখায়, গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে সীমিত নয়, গণতন্ত্র বেঁচে থাকে সহমর্মিতায়, ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতায় এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখায়। শুধু লেখায় নয় আচরণের মাধ্যমেও এর ভিত্তি গড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিবাদের সবথেকে শক্তিশালী উদাহরণ ১৯১৯ সাল। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর ব্রিটিশ সরকারের নাইটহুড উপাধি প্রত্যাখ্যান করলেন। ভাইসরয়কে লেখা চিঠিতে লিখলেন, ‘দ্য টাইম হ্যাজ কাম হোয়েন ব্যাজেস অফ অনার মেক আওয়ার শেম গ্লেয়ারিং।’ সেই সময় এসে গিয়েছে যখন সম্মানের ব্যাজ আমাদের অপমানকে আরও স্পষ্ট ও প্রকট করে তোলে।
এই পদক্ষেপ নৈতিক প্রতিবাদের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এই ঘটনার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে রয়েছে ভারতে তথা বিশ্বে।
তাঁর এঁকে যাওয়া যে দেশের স্বপ্ন আমরা বুনে চলি অবিরত, সে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো দাঁড়িয়ে মানুষের চিন্তা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশের উপর। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক মুক্তির ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন। তার বাস্তব পরিণতি বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা একরৈখিক নয়, তা যে কোনো মতবাদের বাইরে গিয়ে গভীর মানবতাবাদী দর্শনের পথ দেখায়। বারবার উঠে আসে মানুষের স্বাধীনতা, মানুষের নৈতিকতা, মানুষের সৃজনশীলতার উপলব্ধির কথা। সেগুলির দ্বার রুদ্ধ করে কোনো কিছুই পরিপূর্ণভাবে জেতা সম্ভব নয়। হয়তো যে কোনো মূল্যে ভোট জেতা যায়, কিন্তু মানুষকে জেতা যায় না। একটু তরলভাবে বললে, ভোট জয়ের লড়াইয়ে জেতার তাগিদ সবকিছুকে ন্যায্য করে তোলে না। রবীন্দ্রনাথের কথায়, অন্যায়ের উপর দাঁড়িয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
কোনো সভ্যতা যদি মানুষের উপরে রাষ্ট্রকে বসায় তবে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। সে কথাই অবিরত মনে করিয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি আমাদের কোনো চলতি স্লোগান লিখে দিয়ে যাননি। তিনি আমাদের জন্য অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন ছেড়ে রেখে গিয়েছেন। সেগুলি থেকে যদি আমরা পালাই, তাহলে যে দেশে থাকার ইচ্ছা সবার, সে দেশ তৈরি কখনোই সম্ভব হবে না। তাই ...
সহায় মোর না যদি জুটে নিজের বল না যেন টুটে/ সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি, লভিলে শুধু বঞ্চনা/ নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়... জন্মদিনে সব বাঙালির প্রণাম নেবেন রবি ঠাকুর।