সৌরাংশু দেবনাথ, কলকাতা: মুষ্টিবদ্ধ হাত শূন্যে। কখনও ঝাঁকাচ্ছেন, কখনও ঘুঁসি মারছেন। থামছে না দৌড়, সবুজ গালিচায় ছুটেই চলেছেন জয়ের আনন্দে। কে বলবে, ইনি তেম্বা বাভুমা, হাবভাব যে অবিকল বিরাট কোহলির মতো!
সৌরাংশু দেবনাথ, কলকাতা: মুষ্টিবদ্ধ হাত শূন্যে। কখনও ঝাঁকাচ্ছেন, কখনও ঘুঁসি মারছেন। থামছে না দৌড়, সবুজ গালিচায় ছুটেই চলেছেন জয়ের আনন্দে। কে বলবে, ইনি তেম্বা বাভুমা, হাবভাব যে অবিকল বিরাট কোহলির মতো!
রবিবার দুপুরে নন্দন কাননে প্রোটিয়া অধিনায়কের পাগলপারা উচ্ছ্বাসের কারণও রয়েছে। এমনিতেই এই জয় অবিশ্বাস্য। তার উপর শুক্রবার ‘বাউনা’ বা ‘বামন’ বলে খোঁচা শুনতে হয়েছে। অথচ এদিন পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির মানুষটিকেই ব্যাট হাতে দেখাল হিমালয়সমান। চোয়ালচাপা প্রতিজ্ঞা ও অনমনীয় জেদে একাই তফাত গড়লেন। প্রতিকূল বাইশ গজে সিরিজের প্রথম টেস্টের একমাত্র পঞ্চাশ তাঁরই। দু’দলের অন্য কেউ চল্লিশেও পৌঁছননি! ম্যাচের প্রেক্ষাপটে ১৩৬ বলে অপরাজিত ৫৫ তাই সোনার চেয়েও দামি। রীতিমতো বিষাক্ত পিচে বুমরাহ, জাদেজারা মাথা খুঁড়েও তাঁকে ফেরাতে পারেননি। মানতেই হবে, ইডেনে একজনই বামন ছিলেন। কিন্তু তাঁর ব্যাপ্তির সামনে বাকিদের নিতান্তই ক্ষুদ্র, লিলিপুট দেখাল!
শুভমান গিলের অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের দায়িত্ব সামলানো ঋষভ পন্থের কাছে ‘গেমচেঞ্জার’ বাভুমার ইনিংসই। দিনের শেষে আরও বড় স্বীকৃতি দিলেন বুমরাহ। কাছে এসে প্রোটিয়া ক্যাপ্টেনকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। ‘বুমবুম’ হয়তো ক্ষমাও চাইলেন। শুক্রবার পন্থ আর তিনিই তো ‘বাউনা’ বলে চিহ্নিত করেন প্রোটিয়া অধিনায়ককে। জবাবটা অবশ্য দু’দিনেই মিলল। গায়ের রং বা শরীরের আকৃতি নিয়ে যে কাউকে ব্যঙ্গ করা উচিত নয়, মানবতার এই শিক্ষাটা বড্ড জরুরি ছিল। ক্রিকেট যেমন দু’হাত উপচে ভরিয়ে দেয়, তেমনই প্রাপ্যটা বুঝিয়ে ছাড়ে। ইডেন তারই সাক্ষী! মাত্র ১২৩ রানের পুঁজি নিয়ে হার-না-মানা লড়াইয়ের রেসিপি কী? জয়ী অধিনায়কের গলায় তৃপ্তি, ‘এই রানটাকে সবসময় কিন্তু উইনিং স্কোর মনে হয় না। এখানে আমরা লড়াই করেছি, হাল ছাড়িনি কখনও। নিজেদের উপর বিশ্বাস ছিল।’ প্রশ্ন ছুটে এল, অক্ষর প্যাটেলের ক্যাচটা নেওয়ার সময় মাথায় কী ঘুরছিল? একটু চিমটিই মিশে থাকল জবাবে, ‘আমার ছোট ছোট দু’হাতে ক্যাচটা ধরতে পেরে তৃপ্ত। সেই সময় অক্ষরের আউট হওয়া জরুরি ছিল।’ কার্যত ভারতের জয়ের আশা চুরমার ওই ক্যাচেই। ১১ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে দশটাতে জয়, ৩৫ বছর বয়সির রেকর্ড চোখ কপালে তোলার মতো। অথচ, চেহারার জন্য কোনওদিনই প্রাপ্য মর্যাদা পাননি। ছোট থেকে বড় হওয়ার রাস্তা জুড়ে শুধুই অপমান!
গঙ্গাপাড়ের স্টেডিয়াম অবশ্য এদিন অকুণ্ঠ রইল শ্রদ্ধার্ঘ্যে। পঞ্চাশ পূর্ণ করে ব্যাট তোলা বাভুমা পেলেন প্রবল হাততালি। উঠে দাঁড়াল গোটা মাঠ। বর্ণবৈষ্যমের শিকল চুরমার করে এখানেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। আর এদিন এক কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়কের জন্য বরাদ্দ হল প্রাণঢালা ভালোবাসা। আলতো শীতের আমেজমাখা দুপুরে নন্দন কানন জুড়ে ‘সিংহহৃদয়’ বাভুমার জয়ের দৌড় সেজন্যই হয়ে উঠল মুক্তিসংগ্রামের চিরন্তন প্রতীক। অবহেলিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত, শোষিতদের প্রতিবাদের ভাষা।