নরেন্দ্র মোদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ২০১৪ সালে। তার আগে, ২০১৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তাঁকে বিজেপি/এনডিএ-র ‘প্রধানমন্ত্রী মুখ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। দলের একাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয় নেতাকে বাদ দিয়ে সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস/ইউপিএ-কে মোকাবিলার দায়িত্ব গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে যে ব্যক্তিকে কেউই কখনও দেখেনি, অথচ গোধরা কাণ্ডে যাঁর নাম নিয়ে বিস্তর বিতর্ক, সেই নরেন্দ্র মোদিকেই আরএসএস/বিজেপির প্রথম পছন্দ! বিস্ময়ের বড়ো কারণ ছিল সেটাই। যাই হোক, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন দেখিয়ে দিল, পার্টি, এনডিএ, আরএসএস কাউকেই হতাশ করেননি মোদি। তিনি বাজিমাত করেছিলেন যে ইস্যুতে সেটা আর কিছু নয়, বেকারত্ব। যে দেশে ঘরে ঘরে বেকার বা সবচেয়ে বড়ো বাহিনীর নাম বেকারবাহিনী—সেই দেশের রাজনীতিতে এর চেয়ে ফলপ্রসূ তাস যা আর কিছু হতে পারে না, মোদি তা চিনে নিতে একটুও ভুল করেননি। ভোটের প্রচারে তাঁর দাবি ছিল, হাতে হাতে কাজ দিলে এই বেকাররাই সবচেয়ে বেশি সম্পদ সৃষ্টি করতে পারবে। কিন্তু কংগ্রেসের ভুল নীতি, অকর্মণ্যতা, ব্যর্থতা, অপদার্থতার জন্যই কোটি কোটি যুবক-যুবতি বেকার, তাদের দুর্দশার অন্ত নেই। মোদি দাবি করেন, তিনি সরকার গড়তে পারলে বছরে দু-কোটি চাকরি দেবেন!
দেশবাসী তাঁর এই প্রচার সরল মনে বিশ্বাস করেছিল এবং তাঁকে আশীর্বাদও করেছিল দু-হাত তুলে। কেবল কথা রাখেননি মোদি, দেশের প্রধানমন্ত্রী। শুধু প্রথম দফায় নয়, পরবর্তী দু-দফাতেও তাঁকে অন্য ভূমিকায় না পেয়ে দেশবাসী, বেকার শ্রেণি যারপরনাই হতাশ। বছরে দু-কোটি চাকরির গালভরা আশ্বাস মিলিয়ে গিয়েছে হাওয়ায়। পাকাপাকি নিয়োগের বহর ইন্টার্ন এবং অগ্নিবীরের পর্যায়ে নেমে এসেছে। আর এবার খোদ কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যানেই প্রকাশ, দু-বছরের ব্যবধানে সারা দেশে সামগ্রিকভাবে প্রায় ৯ লক্ষ ইপিএফ গ্রাহক বা শ্রমিক/কর্মচারী কমে গিয়েছে। দেশের বেসরকারি সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই শর্তসাপেক্ষে ইপিএফের মতো সামাজিক সুরক্ষা পরিষেবার আওতায় থাকেন। তাই সার্বিকভাবে ইপিএফ গ্রাহকের সংখ্যা কমে যাওয়ার সহজ হিসেবই হল, বেসরকারি সংস্থা/প্রতিষ্ঠানগুলিতে ক্রমশ কাজের সুযোগ হারাচ্ছেন শ্রমিক/কর্মচারীরা। স্বাভাবিকভাবেই এহেন কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ পেতেই মোদি সরকার রীতিমতো চাপে পড়ে গিয়েছে। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫—এই দুই বছরের ব্যবধানেই সারা দেশে ইপিএফ গ্রাহকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে প্রায় পৌনে ৯ লক্ষ। শ্রমমন্ত্রকের অন্তর্ভূত কর্মচারী ভবিষ্যনিধি সংগঠনের (ইপিএফও) সাম্প্রতিক পে-রোল ডেটা রিপোর্ট বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে সারা দেশে নেট পে-রোল বা মোট ইপিএফ সদস্যের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩৮ লক্ষ ৫১ হাজার ৬৮৯। ২০২৩-২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩১ লক্ষ ৪৮ হাজার ২০৪-এ। তারপরের অর্থবর্ষে ইপিএফের নেট পে-রোল আরও কমেছে, যা চিন্তার বিষয়। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এই সংখ্যা হয়েছে ১ কোটি ২৯ লক্ষ ৭৮ হাজার ১৬৮। এমন কেন্দ্রীয় সরকারি খতিয়ানকে অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ বলেই মনে করছে তথ্যাভিজ্ঞ মহল। ১৮ বছরের কম বয়সি, ১৮ থেকে ২১ বছর, ২২ থেকে ২৫ বছর, ২৬ থেকে ২৮ বছর, ২৯ থেকে ৩৫ বছর এবং ৩৫ বছরের ঊর্ধ্বে—বয়সের এই ছয়টি ক্যাটিগরিতে ভাগ করেই ‘নেট’ পে-রোল ডেটা প্রকাশ করে ইপিএফও।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, একইসঙ্গে ইপিএফের মতো সামাজিক সুরক্ষা পরিষেবার আওতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া সদস্যের সংখ্যাও ওই তিন বছরে ক্রমেই বেড়েছে। ২০২২-২৩ সালে ১ কোটি ৩৩ লক্ষ, ২০২৩-২৪ সালে ১ কোটি ৪৯ লক্ষ এবং ২০২৪-২৫ সালে ১ কোটি ৮৩ লক্ষ সদস্য ইপিএফও ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। তবে তাঁরা চাকরি খুইয়ে বেরিয়েছেন, নাকি স্বেচ্ছায় ইপিএফও ছেড়ে দিয়েছেন—রিপোর্ট থেকে তা পরিষ্কার নয়। কারণ যেটাই হোক, এই তথ্যও কেন্দ্রের জন্য যথেষ্ট অস্বস্তিকর। কর্মসংস্থানে জোর দিতে ইতিমধ্যেই ইএলআই স্কিম বা কর্মসংস্থান-ভিত্তিক উৎসাহ ভাতা প্রদানেরও ঘোষণা করেছে কেন্দ্র। তবে কাজের কাজ কিছু হবে কি? মোদির অন্যান্য কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পের মতোই করুণ অবস্থা পিএম বিশ্বকর্মারও। সোজা কথায়, বিস্তর ঢাকঢোল পিটিয়ে নয়া নয়া কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু করাই সার। এটাই সারসত্য মোদিযুগে বেকারত্ব দূরীকরণদর্শনের। শুধুই প্রচার এবং ভোটযন্ত্রে ডিভিডেন্ড তোলাই যখন এক ও একমাত্র লক্ষ্য হয়, তখন সেই সংকীর্ণ রাজনীতির চরম ব্যর্থতার অধিক কিছু প্রসব করার থাকে না।