তাপস ঘোষ, বহরমপুর: দু’দিন নির্জলা উপোস না থাকলে পুজোয় বসতে পারেন না পুরোহিত। বেলডাঙা-১ ব্লকের চৈতন্যপুরে ডাকাতকালীর আরাধনায় এমনই নিয়ম। এই কালীপুজোয় একাধিক ছাগবলি হলেও ফল, মিষ্টান্ন, পরমান্ন দিয়েই দেবীকে ভোগ দেওয়া হয়। গ্রামের হাজরা পরিবার ও মুসলিম সম্প্রদায়ের খাঁ পরিবারের প্রতিষ্ঠিত ডাকাতকালী পুজো ৩০০বছরের প্রাচীন। জানা গিয়েছে, একসময় এই দুই পরিবার ডাকাত হিসেবে এলাকার ত্রাস হয়ে উঠেছিল। অমাবস্যার রাতে এই পুজো দেখতে প্রতিবছর ভিড় উপচে পড়ে। কলকাতার এক পরিবার মানত করে ফল পাওয়ায় প্রতিবছর মায়ের সাজ পাঠায়।
পুজোয় ভুলত্রুটি হলে দেবীর কোপে পড়তে হতে পারে-এই আশঙ্কায় এলাকার ব্রাহ্মণরা ডাকাতকালীর পুজো করতে সাহস করেন না। গ্রামের বাসিন্দা হেমন্ত সিংহ রায় বলেন, যে ব্রাহ্মণ পুজো করতেন, একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। নির্জলা উপবাস থাকা কোনও ব্রাহ্মণের খোঁজ মিলছিল না। ফলে পুজো বন্ধ হতে বসেছিল। অবশেষে পুজোর দিন বিকেলে ঘোড়ামারা গ্রামে এক ব্রাহ্মণের দেখা মেলে। জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে ওই ব্রাহ্মণ স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে দু’দিন অভুক্ত ছিলেন। সেবছর থেকে জগন্নাথবাবু একটানা পুজো করছেন। এটাও মায়ের কৃপা।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, বহুকাল আগে খাঁ পরিবার ও বাগদি সম্প্রদায়ের হাজরা পরিবারের লোকজন এই কালীর সাধনা করেই ডাকাতির উদ্দেশ্যে বের হতো। বিপদে পড়লে নাকি দেবী বিভিন্ন রূপে তাদের উদ্ধার করতেন। ডাকাতদলের কেউ কোনওদিন ধরা পড়েনি। স্থানীয়রা জানান, ১০০বছর আগেও গ্রামের এক প্রান্তে মুলোপুকুরের পাড়ে জঙ্গলে ঘেরা জায়গায় প্রতিষ্ঠিত বেদীতে পুজো হতো। গ্রামের জমিদাররা জায়গা দেওয়ায় হাজরাপাড়ার মন্দিরে দেবীকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
এলাকার বাসিন্দা অমিত সিংহ রায় বলেন, হাজার হাজার মানুষ এখানে মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য মানত করে সুফল পেয়েছেন। ভাদুড় গ্রামের বাসিন্দা ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল বলেন, মায়ের কাছে শুনেছি, আমার যখন তিনদিন বয়স তখন প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। চিকিৎসকরা জবাব দিয়েছিলেন। মা ডাকাতকালীর কাছে মানত করায় আমি সুস্থ হয়ে উঠি।
চৈতন্যপুরে ৮০শতাংশ মুসলিম পরিবারের বাস। যেহেতু খাঁ পরিবারের হাত ধরেই পুজো শুরু হয়েছিল, তাই স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আগে বিসর্জনের আগে খাঁ পরিবারের উঠোনে প্রতিমা নামানো হতো। এখনও খাঁ পরিবার ও হাজরা পরিবারের নামে সংকল্প করেই পুজো শুরু হয়।
পুজো কমিটির সম্পাদক নাড়ু হাজরা বলেন, কয়েকবছর ধরে গ্রামবাসীরা সাহায্য করায় পুজোর আড়ম্বর বেড়েছে। গ্রামবাসীদের আবদারে আমি মায়ের কাছে তিনদিন প্রতিমা রাখার অনুমতি চেয়ে নিয়েছি। পুজোয় পুরো গ্রাম আলোকসজ্জায় সেজে ওঠে।