নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: ফ্যানের হাওয়ায় টেবিলের উপর রাখা ৫০০ টাকার নোটগুলো ফরফর করছে। টেবিলের এপারে থাকা এক ব্যক্তি নোটগুলি রেখে দিয়েছেন। ওপারে চেয়ারে বসে এক মহিলা। টেবিলে রাখা নেমপ্লেট বলছে, ওই মহিলাই পঞ্চায়েত প্রধান। তিনি নোটের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে অঙ্ক কষতে শুরু করলেন। তবে নোট হাতে নিলেন না। টাকা কম থাকায় তিনি যে খুশি নন, সেটা তাঁর কথাতেই বোঝা যাচ্ছিল— এরকমই একটি ভাইরাল ভিডিও (ভিডিওর সত্যতা ‘বর্তমান’ যাচাই করেনি) ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভিডিওতে যাঁকে দেখা যাচ্ছে তিনি গলসি-১ ব্লকের মানকর পঞ্চায়েতের প্রধান ডালিয়া লাহা। ওই ভিডিওতে কোনও এক ঠিকাদারের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন হচ্ছিল। ঠিকাদার বলছেন, পাঁচ হাজার দিয়েছি। তার উত্তরে প্রধানকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ওটা নয় তো। সাবমার্সিবলে ১০ শতাংশ। এই কাজে লাভ থাকে। আগেরটাতে দেবে বলেও দাওনি।
বিরোধীদের অভিযোগ, ওই পঞ্চায়েত প্রধান সাবমার্সিবলের কাজের জন্য ১০ শতাংশ কাটমানি চেয়েছিলেন। চাহিদা মতো টাকা পাননি বলে গোঁসা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান ফোনে বলেন, তাঁকে ফাঁসানোর জন্য ওই ভিডিও করা হয়েছে। টেবিলে পরিকল্পনামাফিক টাকা রাখা হয়েছিল। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি। যিনি ভিডিও করছিলেন তিনি নিজেই টেবিলে টাকা রেখেছিলেন। ভিডিও করার পর আবার টাকা পকেটে ভরে নেন। আমি এক ঠিকাদারের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করেছিলাম। সেই কারণেই সে ষড়যন্ত্র করেছে।
বিরোধীদের দাবি, কাজের জন্য ঠিকাদারদের থেকে ‘পারসেন্টেজ’ নেওয়া বিভিন্ন পঞ্চায়েত এবং পঞ্চায়েত সমিতির রেওয়াজ হয়ে উঠেছে। তবে সব সময়ে প্রধান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিরা এর জন্য দায়ী থাকেন এমনটা নয়। অনেক পঞ্চায়েত সমিতি বা পঞ্চায়েত বকলমে প্রভাবশালীরা নিয়ন্ত্রণ করে। পদাধিকারীদের ভাগ না দিয়ে তাদের কেউ ১০ শতাংশ আবার কেউ ১৫ শতাংশ টাকা পকেটস্থ করে। সেই কারণেই কোনও কাজের গুণমান ভালো হয় না। কয়েক দিনের মধ্যেই কাজের নিম্নমান সামনে আসে। সব কাজেই এক অবস্থা। মানকর পঞ্চায়েতের ওই ঘটনা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ‘স্টিং অপাররেশন’ করলে এ ধরনের আরও ঘটনা সামনে আসবে। বিজেপির বর্ধমান সাংগঠনিক জেলার সভাপতি অভিজিৎ তা বলেন, পঞ্চায়েত অফিসে বসে যেভাবে ‘পারসেন্টেজ’ নেওয়া হচ্ছে তা লজ্জার। তৃণমূল নেতারা পারসেন্টেজ ছাড়া কিছু বোঝে না। কাজ হোক বা না হোক ওদের আগে টাকা পৌঁছে দিতে হবে। তৃণমূল নেতা দেবু টুডু বলেন, কী হয়েছে তা খোঁজ নিয়ে দেখছি। বিজেপি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ায়। এক্ষেত্রে তেমন কিছু হয়েছে কিনা তা দেখা হচ্ছে।
তবে ভিডিও যদি সত্যি হয়, তবে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দল কখনওই অন্যায় কাজে মদত দেয় না। জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক বলেন, ভিডিওর বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। টাকার লেনদেন হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, গলসি-১ ব্লকে শাসকদলের মধ্যে বহুদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছে। ওই প্রধান তার শিকার হয়েছেন কিনা নেতৃত্ব সেটা খোঁজ নিয়ে দেখছে। অভিযুক্ত পঞ্চায়েত প্রধান।-