রাজদীপ গোস্বামী, পিংলা: সুর-ছন্দ-লয়ে বাঁধা পড়ল বাংলার পটশিল্পের ঐতিহ্য। সৌজন্যে এবারের স্বাধীনতা দিবস।
রাজদীপ গোস্বামী, পিংলা: সুর-ছন্দ-লয়ে বাঁধা পড়ল বাংলার পটশিল্পের ঐতিহ্য। সৌজন্যে এবারের স্বাধীনতা দিবস।
পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলাকে বলা হয় বাংলার পটশিল্পের পীঠস্থান। প্রতি বছরের মতো এবারও এখানকার শিল্পীরা পটচিত্রে তুলে ধরবেন স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সংগ্রামীদের নানা মুহূর্ত। আর সেইসব মুহূর্তকে আরও প্রাণ দিয়ে নিজেরাই বেঁধেছেন গান। কথা থেকে সুর—সবই পটশিল্পীদের। কথায় ধরা হয়েছে স্বাধীনতা দিবসের কাহিনি। দুয়ারে পর্যটক এলেই শোনানো হবে দেশাত্মবোধক সেই গান। তারই শেষ প্রস্তুতি এখন পিংলার নয়া গ্রামে। বৃহস্পতিবারের সকাল। ধনদেবীর আরাধনার ফাঁকেই স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের ব্যস্ততা গ্রামের ঘরে ঘরে। পটে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ছবি। গ্রামবাসীরা বলছিলেন, ‘রাত পোহালেই স্বাধীনতা দিবস। পরের দু’দিনও ছুটি। গ্রামে ভিড় জমাবেন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। এবার ভিড় একটু বেশিই হবে। পট শিল্পীদের তৈরি বিভিন্ন জিনিসের বিক্রিও বাড়বে। প্রতিবছর এই সময় ওড়না, শাড়ির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। পর্যটকদের মুগ্ধ করতে এবার আমাদের নতুন সংযোজন স্বাধীনতা দিবসের গান। অবশ্যই সমবেত সঙ্গীত। কেউ কেউ একক কণ্ঠেও গাইবেন।’
পটশিল্পের গ্রামে অত্যন্ত কাছের স্বজন মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া। তিনি এদিন বলছিলেন, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন পটশিল্পীরা। ফলে, গ্রামের আর্থিক অবস্থার আমূল বদল ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চান, বিশ্বব্যাপী পট শিল্পের বিকাশ। পটশিল্পীদের পাশে আমরা সর্বদা থাকব। পিংলার ঐতিহ্যকে বাঁচাতে আমরা বদ্ধপরিকর।’
পিংলার পটশিল্পের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। নয়া গ্রামের মানুষ বহুকাল ধরে বংশপরম্পরা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। গ্রামবাসীদের রং-তুলির আঁচড়ে ফুটে ওঠে কখনও রামায়ণ, মহাভারত। আবার কখনও চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল সহ নানান দেবদেবীর ছবি। বর্তমানে গ্রামের কচি কাঁচারাও শিল্পসৃষ্টিতে মগ্ন। বাড়ির বড়দের থেকে নিয়মিত তালিম পটচিত্র আঁকছে। আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে তালমিলিয়ে পটশিল্পকে যুগপোযোগী করে তুলেছেন গ্রামবাসীরা। কিছু বছর ধরে গেঞ্জির কাপড়ের উপর পটের কাজ করা টি-শার্টের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ওড়না, শাড়ির উপরেও পটের নানা কাজ করে মহিলা-মনও জয় করেছেন। শিল্পীরা বলছিলেন, এখন চায়ের কাপ, ট্রে, কেটলি, ছাতা, কুলো থেকে কাঠের তৈরি ছোট ছোট গয়নার বাক্সেও পটের কাজ করা হচ্ছে। পটের কাজ করা হাত পাখার বিক্রিও বেড়েছে। মেদিনীপুর শহর থেকে ৪১ কিলোমিটার দূরে পিংলার নয়া গ্রাম। কলকাতা থেকে গাড়িতে এন এইচ -৬ ধরে প্রথমে ডেবরা। সেখান থেকে বালিচক হয়ে গ্রামে যাওয়া যায়। এছাড়া বারবেটিয়া হয়েও গ্রামে যাওয়ার রাস্তা রয়েছে। রাজ্যের উদ্যোগে গ্রামের শিল্পকেন্দ্রটি ঢেলে সাজানো হয়েছে। আগে গ্রামে আসা পর্যটকদের জন্য কোনও শৌচালয়ের ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানে দুটি শৌচালয় তৈরি করা হয়েছে। পটশিল্পী বাহাদুর চিত্রকরের কথায়, ‘স্বাধীনতা দিবসের দিন অনেক পর্যটক আসবেন। তাঁদের গান শোনাতে আমরা মুখিয়ে রয়েছি। বিক্রির পরিমাণও ভালোই হচ্ছে। আশা করছি, দুর্গা পুজোর আগে বিক্রির পরিমাণ আরও বাড়বে।’-নিজস্ব চিত্র