সুব্রত ধর, শিলিগুড়ি: এ এক অন্য জীবন সংগ্রাম! নদীয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে শিলিগুড়ি। পাঁচশো কিমিরও বেশি দূরত্ব। যখন আমবাঙালি পুজোর কেনাকাটায় ব্যস্ত, তখন বাবা, মা, স্ত্রী সন্তানকে ছেড়ে শিলিগুড়ির কুমোরটুলিতে ঘাঁটি গেঁড়েছেন নদীয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের মৃৎশিল্পীরা। স্টুডিওতেই পেতেছেন সংসার। তিন মাস ধরে তাঁরা দশভুজার মূর্তি গড়ছেন। তাঁরা বলেন, পেটের টানে পরিবার পরিজন ছেড়ে এই কাজ করতে হচ্ছে। এতেই আমাদের আনন্দ।
শিলিগুড়ি শহরের মহানন্দা নদীর পাড়ে কুমোরটুলি। সেখানেই রথযাত্রা থেকে ঘাঁটি গেড়েছেন দক্ষিণবঙ্গের কয়েকজন মৃৎশিল্পী। তাঁদের মধ্যে একজন নারায়ণ ভট্টাচার্য। নদীয়া জেলার চাকদহে তাঁর বাড়ি। তাঁর দুই ছেলেমেয়ে। নারায়ণ বলেন, বাড়িতে সন্তানদের সামলাচ্ছেন স্ত্রী। ওদের জন্য মন কাঁদলেও কিছু করার নেই। পেটের টানেই পাঁচশো কিমি দূরে এসে প্রতিমা গড়ছি। ভিডিওকলে মাঝেমধ্যে ওদের সঙ্গে কথা বলি। কালীপুজো পর্যন্ত এখানে থেকে প্রতিমা গড়ব।
নারায়ণের টিমে আরও চারজন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন চাকদহ, দু’জন নদীয়ার মুরগাছা এবং একজন পশ্চিম মেদিনীপুরের শিল্পী। তাঁরা ৩০ ফুট লম্বা ও ২৫ ফুট চওড়া স্টুডিওতেই থাকছেন। টিনের চাল ও বেড়া দেওয়া ওই স্টুডিওতেই নাওয়া-খাওয়া। সকালে পুড়ি-সবজি কিংবা রুটি-সবজি টিফিন। দুপুরে ও রাতে ভাত। কখনও ডাল, আলু সেদ্দ, ভাজা, আবার কখনও ডিমের ঝোল। ভোর থেকে কাজে ঝাঁপান। দুপুরে সামান্য সময় বিরতি। আবার বিকেল থেকে রাত ২টো পর্যন্ত চলে কাজ। খড় কাটা, মাটি ছানা, কাঠামো তৈরি, প্রতিমা রূপদান সবটাই করেন। এবার তাঁদের তৈরি প্রতিমা সমতল ও পাহাড়ের বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে দেখা যাবে।
ওই শিল্পীদের মধ্যে আরএকজন চাকদহের ধীমান পাল। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে আছে। প্রতিমা গড়তে গড়তেই তিনি বললেন, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, মুম্বই, ওড়িশা সহ বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে প্রতিমা গড়েছি। এবার এখানে এসেছি। সীমান্তে দেশের সুরক্ষায় বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আছেন জওয়ানরা। এখন আমাদের অবস্থাও ওই জওয়ানদের মতো। দমফেলার সময় নেই। তাই পরিবারের কথা ভুলে প্রতিমা গড়ে চলেছি।
মেগা উৎসব দুর্গাপুজোর কাউন্টডাউন শুরু। আমবাঙালি কেনাকাটায় ব্যস্ত। এই শিল্পীরা অবশ্য বলেন, আমাদের কেউ মাধ্যমিক পাশ। আবার কেউ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন। ভালোবেসে শৈশব থেকে এই কাজ করছি। তাই আমাদের কাছে পুজোর আনন্দ বলে কিছু নেই। দশভুজার রূপ দিয়েই আমরা আনন্দ পাই। নিজস্ব চিত্র।