নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া ও কলকাতা: কখনও হেঁটে যাচ্ছে অভিজাত হোটেলের করিডর দিয়ে। কখনও ‘টেক অফ’ করছে বিমানের বিজনেস ক্লাসে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমনই বিলাসবহুল জীবনযাত্রার ছবি পোস্ট করত শ্বেতা খান ওরফে ফুলটুসি। তবে আর পাঁচজনের মতো লাইক-কমেন্টের আশায় এসব করত না সে। উদ্দেশ্য ছিল অন্য! এসব পোস্টের মাধ্যমে আসলে প্রলোভন দেখানো হতো কমবয়সি মেয়েদের। রঙিন জীবনের হাতছানি সদ্য তরুণী অনেককেই আকর্ষণ করত। তখন তাঁদের টলিউড, ভোজপুরি বা ওড়িয়া ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাইয়ে দেওয়ার টোপ দিত শ্বেতা। ‘টোপ’ গিললে জোর করে নামিয়ে দেওয়া হতো পর্ন দুনিয়ায়। গররাজি হলে জুটত অত্যাচার। আর এই কৌশলেই শ্বেতা খান একজন বার ডান্সার থেকে হয়ে উঠেছিল পর্ন দুনিয়ায় নারী সরবরাহকারী।
শ্বেতা খান বা মহসিনা বেগম বা ফুলটুসি—আসলে একজনই। তার কাজ ছিল টোপ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মেয়ে তুলে আনা। তারপর তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁদে ফেলে পর্ন দুনিয়ায় পাচার করে দেওয়া। সেক্স র্যাকেটে নামতে রাজি না হওয়ায় টানা পাঁচ মাস শ্বেতার ডোমজুড়ে ফ্ল্যাটে অত্যাচারিত হয়েছেন সোদপুরের এক তরুণী। গত শুক্রবার ভোরে সারা শরীরে অজস্র ক্ষত নিয়ে কোনওরকমে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তারপরই সামনে আসে অভিযুক্ত শ্বেতা ও তার ছেলে আরিয়ানের কীর্তিকলাপ। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, এক সময় বারে নাচতে যেত শ্বেতা। সেই সূত্রেই কলকাতা ও বিহারের সফ্ট পর্ন ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। এরপর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কিশোরী ও তরুণীদের প্রলুব্ধ করে জালে তোলার কারবার শুরু করে সে। মাকে সঙ্গ দেয় ছেলে আরিয়ান। ‘ইশারা এন্টারটেইনমেন্ট’ নামে একটি সংস্থা খোলে তারা। পুলিস সূত্রে খবর, সেখানে রিল, প্রোডাক্ট শ্যুটের নামে বিভিন্ন জায়গা থেকে মেয়েদের নিয়ে আসা হতো। ইন্সটাগ্রামে শ্বেতা নিজেকে কখনও টলিউড, কখনও ভোজপুরি, কখনও ওড়িয়া টেলি ইন্ডাস্ট্রির অভিনেত্রী বলে দাবি করত। বিমানের বিজনেস ক্লাসে দিল্লি, মুম্বই নিয়মিত যাতায়াত, অভিজাত জীবনযাত্রার বহু ছবি তার সেই দাবিকে কিছুটা হলেও মান্যতা দিত।
কেউ ‘টোপ’ গিললে সঙ্গে সঙ্গে তাকে কুকর্মে নামিয়ে দেওয়া হতো না। প্রথমে তাঁদের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাতে নিয়ে যাওয়া হতো। প্রোডাক্ট শ্যুটের নামে ভুয়ো ফটোশ্যুট, ‘বোল্ড সিন’ শ্যুট করানো হতো। বলা হতো, এসব ভিডিও বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে রিলিজ করবে। এরপর জোর করে বা ভয় দেখিয়ে সফ্ট পর্নে অভিনয় করতে বাধ্য করত তারা। পুলিস জেনেছে, সোদপুরের নির্যাতিতার সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটিয়েছিল শ্বেতা ও আরিয়ান। তাঁকে মানালি ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল তারা। তারপর ডোমজুড়ের ফ্ল্যাটে নিয়ে এসে তাঁকে পর্ন ফিল্মে অভিনয় করতে চাপ দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় চলে পাশবিক অত্যাচার। শুধু তাই নয়, টেলি সিরিয়ালে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের টোপ দিয়ে কলকাতা, পাটনা, মুম্বইয়ে বার ডান্সারের কাজের জন্য মেয়ে পাচার করত বলে জানতে পেরেছে পুলিস।