Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভোট ও বিপজ্জনক প্রবণতা

একলপ্তে সাড়ে চারহাজার ভুয়ো ভোটার ধরা পড়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটিতে। একই মোবাইল নম্বর জুড়ছে একাধিক নতুন ভোটারের নামের সঙ্গে। জলপাইগুড়িরও একটি ব্লকে চিহ্নিত হয়েছে শ’দেড়েক জাল ভোটার।

ভোট ও বিপজ্জনক প্রবণতা
  • ৩ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

একলপ্তে সাড়ে চারহাজার ভুয়ো ভোটার ধরা পড়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটিতে। একই মোবাইল নম্বর জুড়ছে একাধিক নতুন ভোটারের নামের সঙ্গে। জলপাইগুড়িরও একটি ব্লকে চিহ্নিত হয়েছে শ’দেড়েক জাল ভোটার। রাজ্যে ভোটার লিস্টে ৯২ হাজারের বেশি অবৈধ নাম ঢুকেছে। এমন কয়েকটি অনিয়মের অস্ত্র হাতে নিয়ে মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনকে (ইসিআই) স্বচ্ছ, নির্ভীক এবং নিরপেক্ষ থাকারই দাবি জানিয়ে এল রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের মোদ্দা কথা, কমিশন যেন কারও চাপের কাছেই নত না-হয়। এমনকী, বাংলায় ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে চব্বিশের ভোটার তালিকাকেই ভিত্তি মেনে নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের। মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশির মুখোমুখি বসেছিল তৃণমূলের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল। তাতে ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশ চিক বরাইক, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, অরূপ বিশ্বাস এবং ফিরহাদ হাকিম। দলের পক্ষে তৈরি একটি নথি সামনে রেখে বিভিন্ন ইস্যুতে কমিশনের অবস্থান জানতে চান তাঁরা। তাঁরা একাধিক প্রস্তাবও দেন কমিশনকে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—ভোটার লিস্ট থেকে ভোটযন্ত্র (ইভিএম), আচমকা ভোটার সংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, ভুয়ো ও ডুপ্লিকেট ভোটার, আদর্শ নির্বাচন বিধি লঙ্ঘন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর অপব্যবহার প্রভৃতি। তৃণমূল প্রতিনিধিদের পরিষ্কার কথা, ভোটার লিস্ট শুদ্ধকরণের নামে কোনও ধরনের কারচুপি যেন না-হয়। বিহারে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের উদ্দেশ্যে ২০০৩ সালের যে ভোটার লিস্ট সামনে রাখা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে তা চলবে না। বাংলায় আগামী বিধানসভা ভোটের ভিত্তি হোক গত লোকসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকা। তারপর তালিকায় যাঁদের নাম যুক্ত হয়েছে বা হচ্ছে, তাঁদের নথি-তথ্যাদি যাচাইয়ের জন্য ইসিআই যুক্তিগ্রাহ্য কিছু শর্ত চাপাতেই পারে। সেখানেই খেয়াল রাখতে হবে যে সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবেই হেনস্তার মুখে না পড়েন। গত লোকসভা নির্বাচনের জন্য যে ভোটার লিস্ট গৃহীত হয়েছিল সেটাই তো সাম্প্রতিক। তাহলে পুরনো ভোটার তালিকাকে ভিত্তি হিসেবে মেনে না নেওয়ার কী যুক্তিগ্রাহ্য কারণ থাকতে পারে? সংগত কারণে, ইসিআই কর্তাদের সামনে এই সওয়ালই করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধিরা। 

Advertisement

ভোটের আগেই আচমকা অস্বাভাবিক হারে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে তাঁরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এই প্রসঙ্গে। লক্ষণীয় বিষয় হল, এই নতুন ভোটারের বেশিরভাগই চল্লিশোর্ধ্ব! তাঁরা ১৮-২২ বছর বয়সি হলে সন্দেহের অবকাশ তেমন থাকত না। তাই হাজারে হাজারে মাঝবয়সি নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ার বিষয়টি কোনও যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের শাসক দলের আপত্তি ও সংশয় কোনোভাবেই অমূলক নয়। তাই ভোটের দেড়মাস আগে কোনও জায়গায় একঝাঁক নতুন ভোটার যুক্ত হলে তা সব রাজনৈতিক দলের গোচরে আনার দাবি তুলেছে তৃণমূল। বিষয়টি তারা অবশ্যই যাচাই করে দেখবে। ঘণ্টাদেড়েকের বৈঠকে সতীর্থদের পাশে নিয়ে এমপি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় রীতিমতো তোপ দেগেছেন। বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি রাজ্য পুলিস রাখারও জোরালো দাবি জানিয়েছেন রাজ্যের দুই মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম ও অরূপ বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বাংলার রাজ্যপাল এবং বিরোধী দলনেতার একাধিক বিতর্কিত ভূমিকার উল্লেখসহ আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘের অভিযোগ জানিয়ে রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেস। 
কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ পদাধিকারীরা এবং সংবিধানের দৃষ্টিতে ‘অরাজনৈতিক নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব’ কোনও রাজ্যপাল যদি নির্বাচন বিধি লঙ্ঘন করেন তবে তা সত্যিই দুর্ভাগ্যের বিষয়। তাঁরা নিয়মকানুন জানেন না এমনটা হতে পারে না। অতএব তাঁদের এমন ভূমিকা শুধু অনৈতিক নয়, আইনের দৃষ্টিতেই অপরাধ। অতিশয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়েও ইসিআই যদি মূক-বধিরের মতো করে আচরণ করে তবে ভোট বানচালে অভ্যস্ত দুর্বৃত্তদের শায়েস্তা করা হবে কোন জাদুতে? নির্বাচন হল গণতন্ত্রের উৎসব। জনগণের জন্য নির্বাচিত সরকার তৈরি করতে পাঁচবছর অন্তর বিপুল অর্থব্যয়ে এক-একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ণ স্বচ্ছতার নীতিতে নির্বাচন ছাড়া মানুষের আকাঙ্ক্ষার সরকার গঠন অসম্ভব। বৃহত্তম গণতন্ত্রের মান উন্নত করতে হলে গোড়ার গলদ দূর করতেই হবে। নির্বাচন ব্যবস্থাকে বাঁচাতে হবে উপরে বর্ণিত প্রতিটি বিপজ্জনক প্রবণতা থেকে।

সম্পর্কিত সংবাদ