Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাজনীতির অঙ্ক কষা

চূড়ান্ত টালবাহানা করে কয়েকবছর কাটিয়ে দেওয়ার পর অবশেষে জনগণনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে মোদি সরকার। ২০১১ সালের দশ বছর পর ২০২১ সালে এই জনগণনা হওয়ার কথা ছিল।

রাজনীতির অঙ্ক কষা
  • ৭ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

চূড়ান্ত টালবাহানা করে কয়েকবছর কাটিয়ে দেওয়ার পর অবশেষে জনগণনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে মোদি সরকার। ২০১১ সালের দশ বছর পর ২০২১ সালে এই জনগণনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে তা করা যায়নি। এরপর ২০২৪-এ কেন্দ্র জানিয়েছিল, জনগণনা হবে ২০২৫-এ। কিন্তু আসলে হবে আরও প্রায় দু’বছর পর ২০২৭ সালে। জনগণনার সঙ্গে হবে জাতি গণনাও। এর চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ হতে ২০২৮-২৯ সাল হয়ে যেতে পারে। জনগণনার মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই সঠিক জনসংখ্যার হদিশ পাওয়া। গত চোদ্দো বছর ২০১১ সালের জনগণনার উপর ভিত্তি করেই জনসংখ্যার নানা হিসাব সরকারি-বেসরকারি মহলে ঘোরাফেরা করছে। কারও মতে, ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি। কারও মতে ১৪৩ কোটি, আবার কেউ কেউ মনে করেন ১৪৬ কোটি। তবে একটা বিষয়ে সকলেই একমত, জনসংখ্যার বিচারে চীনকে পিছনে ফেলে এক নম্বর জায়গাটা দখল করে নিয়েছে ভারত। তবে জনগণনা মানে শুধু জনসংখ্যা জানা নয়। এই বিপুল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হলে একটা দেশের প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক অবস্থা, জীবনযাত্রার মান, সামাজিক অবস্থানের ছবিটা স্পষ্ট বোঝা যায়। সত্যিই আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, জনগণনা তার বিস্তারিত তথ্য পেতে সাহায্য করে। বলা যায়, এই তথ্যসমৃদ্ধ রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত। ধনী-দরিদ্র, সাম্য-অসাম্যের ব্যবধান ঘোচাতে উন্নয়নের কর্মসূচি তৈরি করারও কথা। 

Advertisement

কিন্তু সত্যিই কি জনগণনার সুফল দেশের আম জনতার কাছে পৌঁছায়? স্বাধীন ভারতে প্রথম জনগণনা হয়েছিল ১৯৫১ সালে। তারপর সাড়ে সাত দশকে জনগণের জীবনযাত্রার মানের কতটা পরিবর্তন হয়েছে, তার আভাস আগামী জনগণনার প্রশ্নমালা থেকেই পরিষ্কার। খবরে প্রকাশ, আগামী জনগণনায় প্রতিটি নাগরিকের কাছে জানতে চাওয়া হবে, আপনার বাড়ি পাকা না কাঁচা? বাড়ি নিজের না ভাড়া? ঘরের দেওয়াল বাঁশ, কাঠ, ঘাসপাতা, টিন নাকি ইট দিয়ে তৈরি? মূল খাবার ভাত না রুটি? শৌচালয় কি পাকা? রান্না-স্নান-পানীয় জলের উৎস কী? রান্না জ্বালানি গ্যাসে নাকি কাঠপাতা? পরিবারে ক’টা মোবাইল, স্মার্টফোন আছে? বাড়িতে আয়ের উৎস কী? কত রোজগার? বাড়িতে জল-বিদ্যুতের সংযোগ আছে? ইত্যাদি। খোঁজ নিলে জানা যাবে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রার এই ন্যূনতম উপকরণগুলি আছে কি না তা জানার জন্য প্রায় সব জনগণনাতেই কম-বেশি একই ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছে রাষ্ট্রের তরফে। জনগণনা বাদ দিলেও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সমীক্ষা রিপোর্টের মাধ্যমেও এমন বহু প্রশ্নের উত্তর জানা আছে সরকারের। কিন্তু জনগণনা সহ এসব রিপোর্ট যে শেষ বিচারে ঠান্ডা ঘরে স্থান পায়, আগামী জনগণনার সম্ভাব্য প্রশ্নমালা থেকেই তা মালুম হয়। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বাসস্থান-পানীয় জল-কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক অধিকারগুলি যে যুগে যুগে ব্রাত্যই থেকে যায় তা সরকারি রিপোর্টেই পরিষ্কার। সেই সরকারি রিপোর্টই জানিয়ে দেয়, এ দেশ আজও দারিদ্র্য-অপুষ্টি-ক্ষুধা-মানব উন্নয়ন-অসাম্য-ধনী দরিদ্রের ব্যবধানের সূচকে দুনিয়ায় পিছনের সারিতে পড়ে আছে। তবে ঘটা করে সমীক্ষা হয়, আবার জনগণনাও হবে। আসলে এতে আম জনতার সেভাবে ভালো না হলেও লাভ অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলির। তারা এই অভাব, দারিদ্র্য বেচে কুর্সি দখলের লড়াইয়ে নামে। আগামী জনগণনার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ্যে এলে ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দলগুলি যে নতুন করে ঘুঁটি সাজানোর সুযোগ পাবে, তা বলাই বাহুল্য। জনগণ থাকবে সেই তিমিরে। 
’২৭-এর জনগণনার পর অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাবে। যেমন, লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস। জনসংখ্যার অনুপাতে বর্তমানে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩। জনগণনার পর আসন সংখ্যা বেড়ে হতে পারে ৮৮৮। এই আসনের এক তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হওয়ার কথা। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, আসন পুনর্বিন্যাসে লাভ বিজেপির। কারণ দক্ষিণভারত, উত্তরপূর্বের একটি অংশ এবং পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম। তুলনায় এই হার অনেক বেশি বিজেপি প্রভাবিত হিন্দিবলয়ের রাজ্যগুলিতে এবং গুজরাতে। ফলে সাধারণ নিয়মেই দক্ষিণভারত, পশ্চিমবঙ্গের মতো বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলি থেকে লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব কমে যেতে পারে। পক্ষান্তরে হিন্দিবলয়ের রাজ্যগুলিতে সাংসদের সংখ্যা বেড়ে যাবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ওবিসি সংরক্ষণ, যার প্রকৃত সংখ্যা জানতে এবার জনগণনার সঙ্গে জাতিগণনাও হবে। বর্তমানে সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ চালু আছে। জাতিগণনা হলে শুধু ওবিসির সংখ্যাই ৫০ শতাংশ ছাড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে সংরক্ষণের বর্তমান ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিতে হতে পারে। তাতে জেনারেল ক্যাটাগরির আসন সংখ্যা কমবে। এতে বিজেপির ক্ষতি ছাড়া লাভের সম্ভাবনা কম। ফলে নতুন জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংরক্ষণ কী হবে, নতুন সংরক্ষণ নীতি কবে চালু করতে রাজি হবে কেন্দ্রীয় সরকার—তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। তবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত, ’২৭-এর জনগণনার প্রতিফলনে যা কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা, তা ২০২৯-এর লোকসভা ভোটে দেখার সম্ভাবনা প্রায় নেই এবং ২০৩৪ সালের লোকসভা ভোট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ