স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: কাজে ব্যস্ত ছিলেন তরুণী। বিকেলের দিকে অফিস চলাকালীন একটি ফোন পান তিনি। ওপার থেকে বলা হয়, ‘গ্যাসের ডিলার বলছি, আপনার মায়ের নামে যে গ্যাসের কানেকশন রয়েছে। তাতে ভরতুকি বাবদ কিছু টাকা জমা পড়ে রয়েছে। সেটা আপনার অ্যাকাউন্টে ফেরত দেওয়া হবে। মায়ের অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে না’ অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন পেয়ে সন্দেহ হয় গরফা থানা এলাকার বাসিন্দা ওই তরুণীর। তৎক্ষণাৎ বাড়িতে ফোন করেন তিনি। ফোনে গ্যাসের ডিলার পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি যে নাম বলেছিলেন, তা মাকে জানান তরুণী। গৃহকর্ত্রী জানান, নামটি ঠিকই আছে। ফের সংশ্লিষ্ট নম্বরে যোগাযোগ করেন তরুণী। উল্টোদিক থেকে চাওয়া হয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর। সেখানেই টাকা ট্রান্সফার করা হবে। তথ্য শেয়ার করতেই বিপত্তি। তিন দফায় তরুণীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে গায়েব হয়ে যায় ৪৪ হাজার টাকা।
গরফা থানা ও সাউথ সাবার্বান ডিভিশনের সাইবার সেলে অভিযোগ জানিয়েছেন তরুণী। তার ভিত্তিতে তদন্তে নেমেছে পুলিশ। কিন্তু, গ্রাহকের গ্যাসের ডিলারের নাম জানল কীভাবে প্রতারকরা? এই প্রশ্নে জেরবার অভিযোগকারী ও তদন্তকারী, দু’পক্ষই। তাহলে কি গ্যাসের ডিলারের নাম ও তার সঙ্গে যুক্ত গ্রাহকের যাবতীয় তথ্য প্রতারকদের নখদর্পণে? নেপথ্যে বড়সড় প্রতারণা চক্রের গন্ধ পাচ্ছে লালবাজার। কলকাতা পুলিশ সূত্রে খবর, এই ‘আসল’ গ্যাসের ডিলার পরিচয় দিয়ে প্রতারণার অভিযোগ বাড়ছে। শেষ এক মাসে শহরজুড়ে ৩০০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে কলকাতা পুলিশের খাতায়। প্রাথমিকভাবে সাইবার বিভাগের অনুমান, গ্যাস ডিলারের সার্ভার হ্যাক হয়ে থাকতে পারে। এনিয়ে সবকটি থানা ও সাইবার সেলগুলিকে সতর্ক করা হয়েছে। সাইবার প্রতারণার নয়া ট্রেন্ড নিয়ে সচেতনতার বার্তা ও কর্মশালার আয়োজন করা হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কীভাবে হচ্ছে প্রতারণা? গ্যাসের ডিলারের নাম ও বুকলেট নম্বর সঠিকভাবে জানাচ্ছে প্রতারকরা। সেখানেই গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করে নিচ্ছে সাইবার জালিয়াতরা। সাইবার বিভাগ জানাচ্ছে, প্রত্যেক গ্রাহকের গ্যাসের কানেকশনের সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট লিঙ্ক রয়েছে। যে কোনওভাবে গ্রাহকের তথ্য লিক হতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ। কলকাতায় সরকার প্রদত্ত গ্যাস প্রতি ভরতুকি প্রায় ১৯ টাকা। প্রতি গ্যাস সিলিন্ডারের ভিত্তিতে সেই টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে যায়। সেই টাকার কোনও অংশ গ্যাস ডিলারের কাছে থাকা সম্ভব নয়। ফলে এধরনের ফোন প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। তাই ভরতুকির টাকা ফেরানো নিয়ে ফোন এড়িয়ে যাওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন তদন্তকারীরা।
কলকাতা পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, এধরনের প্রতারণার অভিযোগ একেবারে নতুন। ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন। তাই এরকম কোনও ফোন এলে সচেতনতার সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের উপদেশ দিচ্ছে পুলিশ। একইসঙ্গে, ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টারের সাইটে গিয়ে ‘সাসপেক্টেড ফোন নম্বর’ হিসেবে প্রতারণা কলটিকে চিহ্নিত করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নম্বরটি ব্লক করে দেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের সাইবার ক্রাইম পোর্টাল।