নাগপুর: আওরঙ্গজেবের সমাধি সরানোর দাবিতে বিক্ষোভ ও তাকে কেন্দ্র করে গুজবের জেরে সোমবার সন্ধ্যা থেকে প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত সংঘর্ষে উত্তাল হয়েছিল নাগপুর। একদিন পরেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি মহারাষ্ট্রের এই শহর। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সন্ধ্যা থেকেই উত্তেজনা বাড়ছিল। কিন্তু তার পরিণতিতে যে তাণ্ডব চলবে, তা আন্দাজ করতে পারেননি তাঁরা। মঙ্গলবারও আতঙ্কে সিঁটিয়ে রয়েছেন তাঁরা। বাসিন্দাদের একাংশ অবশ্য এই পরিস্থিতির জন্য পুলিসের নিষ্ক্রিয়তাকেও দায়ী করেছেন। চন্দ্রকান্ত কাওরে নামে এক বাসিন্দা জানান, হামলাকারীরা প্রথমে সিসি ক্যামেরা ভেঙে দেয়। তারপর তাঁর বাড়ির সামনে ভাঙচুর চালায়। পুলিস এক ঘণ্টা পর যখন এসে পৌঁছায়, তখন হামলাকারীরা পালিয়ে গিয়েছে। সুনীল পেশনে নামে আর এক বাসিন্দা জানান, অন্তত হাজার জন মানুষ এসে তাঁর গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। আরও ২৫-৩০টি গাড়ি ভাঙচুর করে। সুনীলের বাড়ি লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে হামলাকারীরা। তাতে বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হংসপুরী এলাকার বাসিন্দা শারদ গুপ্তার চারটি বাইক বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা ছিল। হামলাকারীরা সেগুলির সবকটি জ্বালিয়ে দেয়। হামলার শারদও আহত হয়েছেন। ঘটনার এক ঘণ্টা পর পুলিস আসে বলে অভিযোগ তাঁর। তবে পুলিস জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি অভিযুক্তদেরও গ্রেপ্তার করা হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এখনও শহরের বহু জায়গায় কার্ফু বলবত্ রয়েছে।
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সমাধি ছত্রপতি শম্ভাজিনগরের খুলদাবাদ থেকে সরাতে হবে, এই দাবিতে সোমবার সন্ধ্যায় মধ্য নাগপুরের মহাল এলাকায় বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল। সেই বিক্ষোভে ধর্মীয় অবমাননা হয়েছে বলে গুজব ছড়ায়। আর তারপরেই বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় সংঘর্ষ। পুড়িয়ে দেওয়া হয় একের পর এক বাইক, গাড়ি। বাড়ি, দোকানের ভিতর ঢুকে ভাঙচুর চালানো হয়। রক্ষা পায়নি ওষুধের দোকানও।
রাজ্যের মন্ত্রীদের উস্কানিমূলক মন্তব্যের জেরে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে সোমবারই অভিযোগ করেছিল বিরোধীরা। এদিন একধাপ এগিয়ে শিবসেনা (উদ্ধবপন্থী) নেতা আদিত্য থ্যাকারে অভিযোগ করেছেন, মহারাষ্ট্রকেও মণিপুর করার চেষ্টা করছে বিজেপি। মণিপুরে জাতি হিংসার জন্য পর্যটন সহ সমস্ত কিছু বন্ধ হয়ে দিয়েছে। একই পরিস্থিতি এখানেও হতে পারে। উদ্ধব শিবিরের আর এক নেত্রী প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদীর আবার দাবি, ইচ্ছাকৃতভাবে মহারাষ্ট্রের পরিস্থিতি অশান্ত করা হচ্ছে। যাতে সব বিনিয়োগ পাশের রাজ্যে চলে যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাতের দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। আওরঙ্গজেবের সমাধি সরানোর দাবিকে অযৌক্তিক বলেছেন বিএসপি নেত্রী মায়াবতী, এআইএমআইএম নেতা আসাউদ্দিন ওয়াইসি।
যদিও মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ অভিযোগ করেছেন, রীতিমতো ষড়যন্ত্র করে বেছে বেছে বাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘একটি ট্রলি ভর্তি পাথর উদ্ধার হয়েছে। তিনজন ডিসিপি সহ ৩৩ জন পুলিসকর্মীর উপর কুড়ুল দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এতেই পরিকল্পনার ছাপ স্পষ্ট।’ সম্প্রতি ‘ছাভা’ সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই আওরঙ্গজেবের সমাধি সরানো নিয়ে আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়ায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। সেই প্রসঙ্গেও মুখ খুলেছেন ফড়নবিশ। তাঁর যুক্তি, ‘ছাভা’ সিনেমায় দেখানো হয়েছে আওরঙ্গজেব ছত্রপতি শিবাজির পুত্র শম্ভাজির উপর চরম অত্যাচার করেছেন। তা দেখে মানুষের মধ্যে রাগ আরও বেড়েছে। একই কথা শোনা গিয়েছে উপ মুখ্যমন্ত্রী একনাথ সিন্ধে ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আঠওয়ালের মুখেও।