সংবাদদাতা, ডোমকল: বড়দের কাছে হয়তো সামান্য অশান্তি। কিন্তু সেই ছোট্ট ঘটনাই কখনও কখনও শিশুর মনে তৈরি করছে গভীর অভিমান। সেই রকম অভিমানেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ছে তারা। কিছু না ভেবেই ট্রেন, বাস ধরে পৌঁছে যাচ্ছে শত শত কিলোমিটার দূরে। গত সপ্তাহ দেড়েকের মধ্যেই রানিনগর থানা এলাকায় এরকম একাধিক ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক থেকে পুলিশ মহলে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, একটি ঘটনা রানিনগরের এক গ্রামের। বছর তেরোর এক কিশোরের সঙ্গে প্রায়ই দিদির বচসা লেগে থাকত। ঘটনার দিনও দু’জনের মধ্যে ঝামেলা হয়। এরপর ‘খেলতে যাচ্ছি’ বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি সে। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর জানা যায়, কিশোরটি বাসে করে বহরমপুরে যায়। সেখান থেকে ট্রেনে চেপে পৌঁছে যায় কলকাতায়। পরে তাকে উদ্ধার করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে ওই কিশোরই দাবি করে, দিদির সঙ্গে ঝগড়া করেই সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল।
দিনকয়েক আগেই ঠিক একইভাবে রানিনগর থেকে নিখোঁজ হয়েছিল আরও এক শিশু। বছর নয়ের ওই শিশু মা-বাবার অশান্তি দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ত। ঘটনার দিনও বাড়িতে অশান্তির পর অভিমানে কাউকে কিছু না জানিয়ে পকেটে ১২০ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। ট্রেকারে করে প্রথমে কৃষ্ণনগর, সেখান থেকে ট্রেনে শিয়ালদহ পৌঁছে যায়। পরে সেখানে এলাকার এক ব্যক্তি তাকে চিনতে পেরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে বাড়ি ফিরিয়ে আনে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, শুধু এই দু’টি ঘটনাই নয়, গত কয়েক মাসে একাধিক নাবালক-নাবালিকা অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনার তদন্তে নেমে দেখা গিয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পারিবারিক অশান্তি, বকাবকি কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মনোমালিন্যই ছিল মূল কারণ। সময়মতো খোঁজ না পেলে এ ধরনের শিশুরা সহজেই বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলেও মনে করছে ওই সূত্র।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, শিশু ও বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি আবেগপ্রবণ হয়। এই বয়সে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি পরিণত না হওয়ায় তারা অনেক সময় ঝোঁকের বশে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। সেই আবেগের বশেই অনেক শিশু হঠাৎ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার মতো কিংবা তার চেয়েও বড় খারাপ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। পরিবারে অশান্তি, অতিরিক্ত বকাবকি, সমালোচনা বা অন্যের সঙ্গে তুলনা তাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই শিশুদের সঙ্গে ধৈর্য ধরে কথা বলা, তাদের মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে অভিভাবকদেরও কাউন্সেলিং করানো জরুরি। পাশাপাশি স্কুলেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
পুলিশ সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে। অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। শিশুদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা গেলে বা তারা অস্বাভাবিক চুপচাপ হয়ে গেলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।