পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: খাতায়-কলমে রুটিন বদলি দেখানো হত। কিন্তু প্রশাসনের অন্দরের খবর, বীরভূমে পোস্টিং পাওয়ার পিছনে প্রচুর দৌড়ঝাঁপ করতেন পুলিশ-প্রশাসনের কর্তারা। বিভিন্ন লবি ধরা, প্রভাবশালীদের দরবারে কাঠখড় পোড়ানো থেকে লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই-যে কোনো উপায়ে বীরভূম জেলায় পোস্টিং একবার বাগিয়ে নেওয়া। কারণ, আমলা থেকে শুরু করে ছোট-বড় পুলিশ-প্রশাসনের কর্তারা ভাল করেই জানতেন, একবার জেলায় পোস্টিং পেলেই কেল্লাফতে। পাথর ও বালি সিন্ডিকেটের মুকুটহীন সম্রাট টুলু মণ্ডলের সান্নিধ্য একবার পেলেই বদলে যাবে জীবন। সুনির্দিষ্ট খামে পদমর্যাদা অনুযায়ী পৌঁছে যেত টুলুর ‘প্রসাদ’। খামে প্রিন্ট করা থাকত নাম।
দু’দিন আগেই টুলুর এই সুসংগঠিত বেআইনি সাম্রাজ্যের চেহারা প্রকাশ্যে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কড়া ভাষায় তিনি স্পষ্ট করেন, ‘এতে রেজিস্ট্রি অফিস, মোটর ভেহিকেলস, লোকাল পুলিশ, লোকাল পঞ্চায়েত থেকে ভূমিদপ্তর সব যুক্ত আছে।’ সূত্রের খবর, টুলুর বাড়ি ও অফিসে লাগাতার হানা দিয়ে সম্প্রতি প্রচুর নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। কম্পিউটার ও প্রিন্টার এখন তদন্তকারীদের হেফাজতে। সেইসব ডেটা ঘেঁটে এবং কাগজপত্রের সূত্র ধরে এবার সরাসরি সুবিধাভোগী আধিকারিকদের নামের তালিকা তৈরি করতে শুরু করেছে পুলিশ।
টুলুকে আজকের বেপরোয়া জায়গায় বসানোর নেপথ্যে মূল অবদান ছিল জেলা তৃণমূলের এক শীর্ষনেতার, যাঁর কথায় একসময় ওঠবস করত গোটা বীরভূম। বেআইনি খাদান থেকে পাথর বা বালি তোলা কিংবা ওভারলোডেড ডাম্পার পার করা, সব ক্ষেত্রেই ‘উপঢৌকন’ খেয়ে চোখ বন্ধ করে থাকতেন কর্তারা। সেই ‘মধু’র লোভে কতদূর যাওয়া যায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ ভূমিদপ্তরের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্তা। বিডিও হিসেবে পদোন্নতি পেয়েও তিনি প্রমোশন প্রত্যাখ্যান করে এই জেলাতেই পড়ে ছিলেন। এমনকী, অবসরের পরও এক্সটেনশন নিয়ে চালিয়ে গিয়েছেন দপ্তরের কলকাঠি। গরিবের জমি, সরকারি খাস জায়গা কিংবা বনভূমি রাতারাতি টুলুর নামে রেকর্ড করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে পকেট গরম করেছেন তিনি। পাশাপাশি একাধিক বেআইনি বালি খাদানের বখরাও পকেটে ভরেছেন তিনি। নামে-বেনামে এই জেলাতেও প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে ওই কর্তার।
শুধু ভূমিদপ্তর নয়, পুলিশের ভিতরকার আঁতাতও এখন আতসকাচের তলায়। অনুব্রত মণ্ডলের জেলখাটা ‘কোটিপতি’ দেহরক্ষীর পরম মিত্র এক পুলিশকর্তা খাতায়-কলমে নির্দিষ্ট থানার দায়িত্বে থাকলেও তিনিই ছিলেন জেলার অঘোষিত ‘এসপি’। বালি ও পাথরের কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে তাঁরই অঙ্গুলিহেলনে। ২০১৮সালে অলিখিতভাবে টোল আদায়ের ভার টুলুর হাতে যাওয়ার পর জন্ম নেয় জাল ‘ডিসিআর’। যা ছিল তোলাবাজির নতুন মডেল। যার রুটম্যাপ কষতে টুলুকে সাহায্য করেছেন প্রচুর আমলা।
তবে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান এসব আধিকারিকদের স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রেখেছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভূমিদপ্তর, পুলিশ কারও বিরুদ্ধে কিছু থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও অ্যাকশন নেওয়া হবে।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া অবস্থানের পর বীরভূম জেলায় একসময় কাজ করা পুলিশ ও প্রশাসনের বহু রথী মহারথীর রাতের ঘুম উবে গিয়েছে। তদন্তের জালে কোন কোন বড় মাছ ধরা পড়ে, এখন নজর সেদিকেই। বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা বলেন, সেইসময় এক পুলিশ অফিসার এসবের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন। যিনি আমাকে জেল খাটিয়েছিলেন। তদন্ত হলে সবাই ধরা পড়বে।