Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাজ্য বাজেটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার

অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করে তুরুপের তাস ফেললেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। চলতি ফেব্রুয়ারি থেকেই লক্ষ্মী ভাণ্ডারে ভাতার বরাদ্দ পরিমাণ ও প্রাপকের ব্যাপ্তি বাড়ল।

রাজ্য বাজেটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার
  • ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়:  অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করে তুরুপের তাস ফেললেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। চলতি ফেব্রুয়ারি থেকেই লক্ষ্মী ভাণ্ডারে ভাতার বরাদ্দ পরিমাণ ও প্রাপকের ব্যাপ্তি বাড়ল। এই বাজেটে ষ্পষ্ট করে দিলেন, তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরলে বেকার যুব থেকে প্রান্তিক কৃষক, শ্রমিক, প্যারাটিচার, আশাকর্মী, গ্রিন পুলিস, সিভিক ভলান্টিয়ার সকলেরই প্রাপ্য বাড়বে। বাড়ল মহার্ঘ ভাতা। সাকুল্যে নানা প্রকল্পে সুবিধাপ্রাপ্ত মহিলাদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ হল প্রায় ৫০-৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই বাজেটে সর্বাধিক সুবিধা পেলেন রাজ্যের মহিলারা। রাজনৈতিক বিচারে এই বাজেট ভোটমুখী, কিন্তু একইসঙ্গে অর্থনীতির বিচারেও যথেষ্ট ইতিবাচক। বাজেট কীভাবে রাজ্যে উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে পারে তারও একটা সুস্পষ্ট দিক নির্দেশ রয়েছে এই অন্তর্বর্তী বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাবে।

Advertisement

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, একটি অন্তর্বর্তী বাজেট মানে মাত্র চারমাসের একটি আপৎকালীন ব্যয় সংস্থানের সীমিত প্রস্তাব, তাই তাতে কর সংগ্রহ বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ, শিল্প কৃষি বাণিজ্যে অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার উল্লেখ থাকে না। স্বভাবতই অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বা মানুষের কর্মদক্ষতা ও মাথাপিছু আয় বাড়াতে যে ঘোষণাগুলো করা উচিত সেগুলো এই বাজেটে সম্ভব নয়। তবুও রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অন্তর্বর্তী বাজেট পেশের মধ্যে দিয়ে আর্থিক উন্নয়নের যে রোড ম্যাপ দেখিয়েছেন তাতে বোঝা যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার ক্ষমতায় ফিরলে প্রান্তিক সমাজের খেটেখাওয়া মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের স্বার্থেই চলবেন। তাই এই বাজেটে প্রায় ১০০টি সামাজিক প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে। বহু প্রকল্পে নতুন করে ভাতা চালু করা হয়েছে। আগেরগুলি বজায় রাখা হয়েছে। সমালোচকদের মনে হতে পারে, এই সরকার ‘ভাতার অর্থনীতি’ চালু করেছে। কিন্তু প্রশ্ন এখানেই। শুধুই ভাতা দিয়ে একটি রাজ্যে উন্নয়ন করা? কর্মসংস্থান গড়ে তোলা? বেকারি কমানো? রাজ্যের উন্নয়ন বৃদ্ধি করা সম্ভব? কিন্তু এটাও সত্যি সবশ্রেণির মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এমন মহৎ উদ্যোগকেও কোনওমতে খাটো করে দেখানো সম্ভব নয়। যখন বারবার তা করে দেখিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

গত ১৫ বছরে ক্ষমতায় আসার পর এই রাজ্য সরকার অর্থনীতির বিভিন্ন মানদণ্ডে অগ্রগতি ঘটিয়েছে। অনেক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে বেকারি প্রশ্নে সবথেকে বেশি আক্রমণ করা হয় সেই নিরিখে প্রথমেই বলা যেতে পারে কেন্দ্রের হিসেবে ৪৫.৬৭ শতাংশ বেকারি বা কর্মহীনতা কমেছে এরাজ্যে। আর গত ১৫ বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি! ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয় ছিল ৮০,০০০ টাকা। এটি বেড়ে ১,১৫,০০০ টাকা হয়েছিল ২০২০ সালে। ২০২৪ সালে মাথাপিছু আয় আনুমানিক ১,৫০,০০০ টাকার কাছাকাছি। একইভাবে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ২.৫ শতাংশ আর্থিক ঘাটতি কমিয়ে নিজের সূত্র থেকে সম্পদ সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানো গেছে প্রায় ৬ গুণ! ফলে লক্ষীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, যুবসাথী, কন্যাশ্রী, যুবশ্রী ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে রাজ্য সরকার যে ভাতা দিচ্ছে সেটা কার্যত মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের স্বীকৃতি এবং প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়ন। বিভিন্ন প্রকল্পে ভাতা দিয়ে অর্থনীতিতে সমান্তরাল চাহিদা সৃষ্টির পথ তৈরি করে নেওয়া যাচ্ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। এই পথে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন বৃদ্ধির হার বাড়ানোর রাস্তা প্রশস্ত করা মোটেই মুখের কথা নয়।

একইসঙ্গে জিএসটি সূত্রে প্রাপ্য বেড়েছে ৫ গুণ। ফলে বিভিন্ন পরিকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে রাজ্য নিজেই এগিয়ে যেতে পেরেছে। এই অন্তর্বর্তী বাজেট এই দিকটিই ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। আগামিদিনে ক্ষমতায় ফিরলে মমতা সরকার যে এই পথেই সাধারণ খেটেখাওয়া প্রান্তিক মানুষ ও মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভাতা প্রদানের মাধ্যমে উন্নয়ন ঘটাতে পারবে, সেই দিশাই দেখাল আজকের অন্তর্বর্তী বাজেট। এর সঙ্গে কেন্দ্রের কাছ থেকে প্রাপ্য ২ লক্ষ কোটি টাকা পাওয়া গেলে যে আর্থিক প্রগতি রাজ্যের আরো বাড়তে পারত সেটা বলাই বাহুল্য। তথ্য-প্রযুক্তি শিল্প থেকে শুরু করে টেলিকম শিল্প এবং বিভিন্ন প্রকল্পে রাজ্যে গত পাঁচবছরে লগ্নি ঊর্ধ্বমুখী। সব মিলিয়ে রাজ্যের অর্থনীতিতে তাই উন্নয়নের হার বেড়েছে নিজস্ব পরিকল্পনার সাফল্যে। রাজ্যে কর্মসংস্থান তৈরি না করে শুধুই ভাতা দেওয়া হচ্ছে, এধরনের কথা বলা তাই অর্থনৈতিক যুক্তিতে ঠিক নয়। এমনকি একথাও বলা যায় না যে, পশ্চিমবঙ্গ অন্যরাজ্যের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে। কারণ দেশের মধ্যে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে  পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে সেরা স্থানে আছে। পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে শীর্ষস্থানে আছে অসংগঠিত ক্ষেত্রে ও কৃষিতে, মৎস্যচাষে এবং ১০০ দিনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতন প্রকল্পে। তাই জনকল্যাণকর অর্থনীতি কীভাবে প্রান্তিক মানুষের আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত হতে পারে, এই রাজ্যের অর্থনীতি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই আলোকে বিচার করতে গেলে বলা যায়, এই অন্তর্বর্তী বাজেট কার্যত সাধারণ প্রান্তিক মানুষের বাজেট। এই বাজেটে ভূমিহীন কৃষক থেকে গিগ ওয়ার্কার, আশাকর্মী সকলেরই কথা ভাবা হয়েছে। এই বাজেট বিকল্প উন্নয়ন ভাবনার দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের একটি অঙ্গাঙ্গী পদক্ষেপ। একে আলাদা করে দেখলে গুরুত্বহীন বলে মনে হবে। কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে যে দিশা দেখানো হয়েছে তাতে আগামিদিনে রাজ্যের পিছিয়ে পড়া মানুষের মাথাপিছু ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। কারণ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে ভাতাদান চাহিদা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। কারণ, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ বাড়ল। আশাকর্মী, সিভিক ভলান্টিয়ারসহ ভূমিহীন কৃষিকর্মীরা ভাতা পাবেন। ফলে  সমাজের তৃণমূল স্তরে বাড়বে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা। স্বাভাবিকভাবেই ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি হবে। তাতে বাড়বে জিএসটি আদায়ও। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ৫৬ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা জিএসটি আদায় ধরা হল।

তবে হ্যাঁ, দিশা মহৎ হলেও বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ কম। মহাত্মাশ্রী প্রকল্পে ২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে আপাতত এই অন্তর্বর্তী বাজেট যা বরাদ্দ করেছে তার পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে। তামিলনাড়ু মহারাষ্ট্র বা দেশের অন্য উন্নত ছয় রাজ্যের তুলনায় এই রাজ্যের শিল্প উন্নয়ন অনেক কম। এখানে কম মাথাপিছু আয়ও। কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পরিকাঠামো শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে প্রচুর সম্ভাবনা আছে। তার সম্ভাবনা বাড়াতে রাজ্যকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক প্রযুক্তি ও উৎপাদনমুখী শিল্প উন্নয়নের পথ ধরতে হবে। তার জন্য অন্তর্বর্তী বাজেটে উল্লেখ তেমন নেই, থাকার কথাও নয়। তবে নতুন সরকার গড়লে পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করবার সময় এই দিকগুলি ভাবার চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবুও বলতেই হবে কেন্দ্রের সীমাহীন অসহযোগিতা, প্রাপ্য টাকা আটকে রাখা সত্ত্বেও গরিব মানুষের স্বার্থে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের এই উদ্যোগ বিশেষ প্রশংসনীয়।

 লেখক প্রাবন্ধিক ও অর্থনীতির বিশ্লেষক। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ