নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ঝকঝকে শার্ট। চোখে স্টিল ফ্রেমের চশমা। পায়ে পালিশ করা জুতো। হাসপাতালের ভিতর এক ঝলক দেখলে ডাক্তার ছাড়া অন্য কিছু মনে হবে না। আদতে সে দালালচক্রের সক্রিয় সদস্য। ডাক্তারের বেশে থাকা যুবকের ফাঁদে পড়েই রাজ্যের অন্যতম সেরা সরকারি হাসপাতাল পিজিতে ধর্ষণের শিকার মনোরোগে আক্রান্ত এক রোগিণী। নির্যাতিতার বয়স ১৪ বছর।
বুধবার ভরদুপুরে ঘটনাটি ঘটেছে ট্রমা কেয়ার সেন্টারের একতলার শৌচাগারে। আর জি করের পর ফের সরকারি হাসপাতাল। ফের ধর্ষণের অভিযোগ। এবার নির্যাতিতার পরিচয়, সে নাবালিকা রোগিণী। তার মায়ের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ধর্ষণ ও পকসো আইনে মামলা রুজু করেছে ভবানীপুর থানা। বুধবার রাতেই ধাপা রোড থেকে অভিযুক্ত অমিত মল্লিককে (৩৪) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় ফের প্রশ্নের মুখে পড়েছে হাসপাতালের নিরাপত্তা।
লালবাজার জানিয়েছে, নাবালিকা ধর্ষণে ধৃত অমিত শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের গ্রুপ-ডি কর্মী ছিল। বছরখানেক আগে তার চাকরি যায়। কী কারণে চাকরি গিয়েছিল? তা এখনও স্পষ্ট নয়। এসএসকেএম হাসপাতাল সূত্র জানাচ্ছে, চাকরি যাওয়ার পর থেকেই পিজির দালালচক্রে যুক্ত হয় সে। ডাক্তার বেশেই রোগীর পরিবারদের টার্গেট করত। টাকা নিয়ে রোগী ভর্তি, বা অ্যাম্বুলেন্স বুকিং—সবই চলত অমিতের অঙ্গুলিহেলনে। তার জেরেই প্রতিদিন হাসপাতালে আসা-যাওয়া ছিল তার। ঢুকে পড়ত অন্দরমহলেও। বুধবারও সকালে হাসপাতালে ঢোকে অমিত। ওইদিন সকালে বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজিতে মনোরোগ চিকিৎসককে দেখাতে এসেছিল নাবালিকা। তার সঙ্গে মা-ও ছিল। ট্রমা কেয়ার সেন্টারের সিসি ক্যামেরা বলছে, দুপুরে বাঙ্গুর ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজি থেকে উডবার্ন ওয়ার্ডের পিছন দিক দিয়ে ট্রমা কেয়ার সেন্টারে আসতে দেখা যায় রোগিণীকে। কিন্তু তখন সঙ্গে মা নন, নীল শার্ট পরা অমিত। সরাসরি ট্রমা কেয়ার সেন্টারে ঢুকে যায় তারা।
ট্রমা কেয়ার সেন্টারের একতলায় রয়েছে এমআরআই ও সিটি স্ক্যান পরীক্ষার জায়গা। তার পাশেই একটি শৌচাগার। যেখানে বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষেধ। অভিযোগ, সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয় কিশোরীকে। মহিলা শৌচাগারের ভিতরেই ধর্ষণ করা হয়। চিৎকার শুরু করে নির্যাতিতা কিশোরী। বিপদ বুঝে ঘটনাস্থল থেকে চম্পট দেয় অভিযুক্ত। আর্তনাদ শুনতে পান ট্রমা কেয়ার সেন্টারেরই এক চিকিৎসক। তিনিই কিশোরীকে উদ্ধার করেন। ফোনে বাঙ্গুর ইনস্টিটিউটে থাকা মাকে গোটা বিষয়টি জানান নাবালিকা। হাসপাতাল সূত্রে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছোয় ভবানীপুর থানার অন্তর্গত এসএসকেএম আউটপোস্টের পুলিশ। নির্যাতিতাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। ওই যুবকের সঙ্গে কেন ট্রমা কেয়ার সেন্টারে গেলেন নাবালিকা?— প্রশ্ন করেন তদন্তকারীরা। সূত্রের খবর, কিশোরীকে বাইরে বসিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে বাঙ্গুর ইনস্টিটিউটের ভিতরে গিয়েছিলেন মা। নাবালিকাকে একা দেখে ডাক্তার বলে পরিচয় দেয় অমিত। মনোরোগের ভালো চিকিৎসক দেখানোর নাম করে ট্রমা কেয়ার সেন্টারে নিয়ে যায়। এরপরই ধর্ষণ করা হয় তাকে। এসএসকেএম হাসপাতালেই নির্যাতিতার মেডিকেল পরীক্ষা করা হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, তাতে নাবালিকাকে ধর্ষণের প্রমাণ মিলেছে।
নির্যাতিতার বক্তব্যের ভিত্তিতে দ্রুত ট্রমা কেয়ার সেন্টারের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখেন তদন্তকারীরা। চিহ্নিত হয় অভিযুক্ত অমিত। পুলিশ গোপন সোর্স কাজে লাগিয়ে অভিযুক্তের খোঁজে নামে। রাতেই প্রগতি ময়দান থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় অমিত মল্লিককে। বৃহস্পতিবার ভাইফোঁটা উপলক্ষে ছুটি থাকায় ধৃতকে পকসো আদালতের বদলে আলিপুর আদালতে পেশ করে ভবানীপুর থানার পুলিশ। বিচারক তাকে একদিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। লালবাজারের দাবি, কীভাবে ঘটনাটি ঘটল, তার তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থলের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। কিন্তু এক বহিরাগত হাসপাতালে নিষিদ্ধ স্থানে ঢুকল কীভাবে? তা নিয়ে মুখে কুলুপ পুলিশের।