তীর্থের অর্থ হচ্ছে ‘তরয়তি স্থানং যঃ স তীর্থ।’ মানুষকে ভববন্ধন থেকে উদ্ধার করে জ্ঞান বৈরাগ্য ও তপস্যার দ্বারা, ভগবান লাভ বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করার উদ্দীপনা যে স্থানে হয়, সে স্থানকে তীর্থ বলা হয়। যেখানে যুগে যুগে অবতারগণ জন্মগ্রহণ করেন এবং যে স্থানে অবতারগণ তাঁদের দিব্যলীলা প্রকট করেন, সে স্থানকেও তীর্থ বলা হয়। যুগ যুগ ধরে যে প্রবাহ পবিত্র তীর্থস্বরূপ এবং সাক্ষাৎ ব্রহ্মবারি বলে খ্যাত, সে গঙ্গার পৃথিবীতে অবতরণের আগে যে বিস্ময়কর ঘটনাটি আছে, তা তীর্থ সম্বন্ধে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ভগীরথ তাঁর পূর্ব পিতৃপুরুষদের সগর বংশের উদ্ধারের জন্য মা গঙ্গাকে পৃথিবীতে আনবার জন্য শিবের উদ্দেশে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। শিব ভগীরথের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মা গঙ্গাকে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে অবতরণের আদেশ দিলেন, তখন মা গঙ্গা বলেছিলেন—পৃথিবীতে গেলে বহু লোক নানান পাপকার্য, কুকর্ম করে, সে পাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য আমাতে স্নান করে সে পাপগুলোকে আমায় দিয়ে তারা মুক্ত হয়ে যাবে। এইভাবে অগণিত লোকের পাপ গ্রহণ করলে আমি সেই পাপ থেকে কি করে মুক্ত হব? তখন শিব বলেছিলেন—খালি পাপীরাই তোমাতে স্নান করবে? পুণ্যাত্মারা, ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষেরা, অবতার পুরুষরাও তো তোমাতে স্নান করে, তোমাকে দর্শন স্পর্শন দ্বারা তোমাতে সঞ্চিত পাপগুলো ধুরে মুছে শুদ্ধ করবে। অতএব তুমি সদা সর্বদা চির পবিত্রই থাকবে।
কোনও ভয় নেই, তুমি নির্ভয়ে ভগীরথের সঙ্গে মর্তে গমন কর। তখন মা গঙ্গা ভগীরথের সঙ্গে মর্তে নেমে সাগরদ্বীপে সগর বংশের রাজাদের ভস্মের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সগর বংশের সব রাজাদের উদ্ধার করে সাগরে মিলিত হলেন। এ উপাখ্যান দ্বারাই প্রমাণিত হলো মহাপুরুষরা তীর্থ স্থানাদিতে বাস বা দর্শন ও স্পর্শন দ্বারা তীর্থকে তীর্থত্ব প্রদান করেন। তাই ভক্তিসূত্রে নারদ বলছেন—‘তীর্থী কুর্বন্তি তীর্থানি’ অর্থাৎ যাঁরা ভগবদ্ দর্শন করেছেন বা অবতার বা সিদ্ধপুরুষরা তীর্থকে তার হারানো তীর্থত্বকে পুনঃ প্রদান করে চির পবিত্রভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। এ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুরের ভক্ত গিরিশ ঘোষের জীবনে একটি বিশেষ বিস্ময়কর ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
তখনকার দিনে বেলুড়মঠে নীলাম্বরবাবুর বাগানে ছিল। স্বামী বিবেকানন্দ নীলাম্বরবাবুর বাগানবাটীতে বাস করছিলেন। একদিন গিরিশ ঘোষ কলকাতা থেকে মঠ দর্শন ও স্বামীজীকে দর্শন করতে নীলাম্বরবাবুর বাগানে এলেন। তিনি মঠে এসে প্রথমে গঙ্গার ঘাটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গঙ্গাকে একটু স্পর্শ করে পরে মঠের ঠাকুরের মন্দিরে প্রবেশ করলেন, সে সময় স্বামীজী মঠের ছাদে বসে কয়েকজন সাধু, ব্রহ্মচারীর সঙ্গে শাস্ত্রালাপ করছিলেন।
স্বামী সৎপ্রভানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ও রঙের গামলা’ থেকে



