নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: রবিবার ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা ছ’টা। সিউড়ি বাস স্ট্যান্ডের অদূরে পরিচিত চায়ের দোকানটায় তিল ধারণের জায়গা নেই। আজ সোমবার নির্বাচনের ফলাফল। কে জিতবে, সেই নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। টেলিভিশনের বুথ ফেরত সমীক্ষা বা ‘এগজিট পোল’ নিয়ে বিশেষ হেলদোল নেই সাধারণ মানুষের। তাঁদের সাফ কথা, টিভির হিসেবে বীরভূমকে চেনা দায়, আসল খেলা তো ইভিএম খুললে বোঝা যাবে। প্রবীণ এক ভোটার একগাল হেসে বললেন, ‘টিভির লোকগুলো কি আর আমাদের গ্রামের মাটির টান বোঝে? ভোট যে কোন তল্লাটে কোন দিকে ঘুরেছে, তা কাল ইভিএম না খুললে দিল্লির লোক জানবে না।’
তবে চায়ের আড্ডায় কেবল কথার লড়াই নয়, তলে তলে বীরভূমের আনাচে কানাচে চলছে রুদ্ধশ্বাস বাজির লড়াই। সিউড়ি থেকে রামপুরহাট, রাস্তার মোড়ে বা পানের দোকানে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে হাজার হাজার টাকার ‘চ্যালেঞ্জ’। কেউ নিজের পছন্দের প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান নিয়ে নিশ্চিত, কেউ আবার পরিবর্তনের দাবিতে অনড়। এই বাজি যেমন নগদে হচ্ছে, তেমনই কোনো কোনো এলাকায় খাসি বা এলাহি ভোজের ওপর বাজি ধরা হয়েছে বলেও শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে সিউড়ি, ময়ূরেশ্বর বা রামপুরহাটের মতো হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে জল্পনা এখন তুঙ্গে।
এই অনিশ্চয়তার সবথেকে বড় প্রভাব পড়েছে শহরের পাইকারি বাজারগুলোতে। অন্যান্য বার নির্বাচনের ফল প্রকাশের অন্তত দু’ দিন আগে থেকেই সিউড়ি, সাঁইথিয়া থেকে বোলপুর, সর্বত্র জেলার বাজারে আবিরের রমরমা থাকে। কোন দল জিতছে, তার একটা আগাম আভাস পেয়ে ব্যবসায়ীরা বস্তা বস্তা আবির মজুত করতে শুরু করেন। সাধারণত তৃণমূলের জয়ের আশায় সবুজ এবং বিজেপির জয়ের প্রত্যাশায় গেরুয়া আবিরের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। কিন্তু এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আশঙ্কায় বহু ব্যবসায়ীই ঝুঁকি নিতে নারাজ। ফলে অনেক দোকানেই আবিরের মজুত অন্যান্য বারের তুলনায় অনেক কম। সাঁইথিয়ার এক পুরনো আবির ব্যবসায়ী জানালেন, ‘বড্ড ধাঁধায় আছি দাদা। সবুজ আবির বেশি রাখব না গেরুয়া, সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না। যদি হিসেব উল্টে যায়, তবে তো লোকসান। তাও ঝুঁকি নিয়েই সবুজ আবির মজুত করেছি। আশা করছি বিফলে যাবে না।’ ব্যবসায়ীদের এই দোটানাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এবার ভোটের লড়াই কতটা শেয়ানে শেয়ানে হয়েছে।
তবে রঙের বাজারে খরা থাকলেও মিষ্টির বাজার কিন্তু আজ রীতিমতো চাঙ্গা। জয়ের রং সবুজ হোক বা গেরুয়া— মিষ্টিমুখ যে অবধারিত, তা ভালোই বুঝছেন ব্যবসায়ীরা। তাই ফল প্রকাশের আগের দিন থেকেই প্রত্যেক বিধানসভা এলাকার বড় বড় মিষ্টান্ন ভাণ্ডারগুলোতে নাওয়া খাওয়া ভুলে দেদার মিষ্টি বানানো চলছে। রসগোল্লা, পান্তুয়া থেকে শুরু করে লর্ড ল্যাংচা, সবকিছুরই বিপুল বিক্রির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। অনেক দোকানদার জানালেন, ফল বেরনোর পর কোনোভাবেই যাতে মিষ্টির আকাল না পড়ে, তাই রবিবার রাতভর কারিগররা কাজ করবেন। আবির ব্যবসায়ীরা যেখানে সংশয়ে, মিষ্টির কারিগর সেখানে আত্মবিশ্বাসী। কারণ জয় যাঁরই হোক, মিষ্টির বাক্স হাতে ভিড় জমবে দুই পক্ষেই।
এখন কেবল কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা, আজ দুপুরেই লাল মাটির বীরভূমের রাজনৈতিক ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে স্পষ্ট হবে জনতা জনার্দনের রায়। স্পষ্ট হয়ে যাবে, রাজ্য আদৌ পরিবর্তনের পথে হাঁটছে, নাকি বাংলার ক্ষমতা থাকছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই।