নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দেশবাসী কি অত্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন? অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় বিপদে পড়তে পারেন বলে মনে করছেন তাঁরা? স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (এসবিআই) একটি রিপোর্ট বলছে, সম্প্রতি মানুষ নিজের কাছে নগদ টাকা বেশি করে রাখতে শুরু করেছেন। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনে যে টাকা খরচ করেন, তার বাইরেও থোক নগদ টাকা রেখে দিচ্ছেন নিজের কাছে। এদিকে সেই টাকা যে খুব আনন্দের সঙ্গে জোগাড় করছেন, তা নয়। বরং সংসার খরচ সামলে, বলা ভালো ভাতের খরচ কমিয়ে সেই টাকা জোগাড় করছেন তাঁরা। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্টই বলছে, মানুষ খাই-খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির জেরে।
এসবিআই রিপোর্ট বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে সাধারণ মানুষ যেকোনো অনিশ্চয়তার জন্য নিজের কাছে মাত্র ৫৩২ টাকা রাখতেন। সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সেই টাকা বেড়ে পৌঁছেছে ৯ হাজার ১২৭ টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সেই অঙ্ক ছিল ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং তার আগের বছর তা ছিল ১ হাজার ৮০৬ টাকা। এই পরিসংখ্যানই বলছে, মানুষের মধ্যে আর্থিক অনিশ্চয়তা কতটা বেড়েছে।
প্রশ্ন হল, মানুষের হাতে কি সত্যিই নগদ টাকা বেড়েছে, যা দিয়ে মানুষ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য নগদ জোগান বাড়াচ্ছেন? খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্টই বলছে, খাবারের পিছনে খরচ ক্রমশ কমাচ্ছেন বা কমাতে বাধ্য হচ্ছেন ভারতবাসী। এমনকি পরিবারভিত্তিক খাদ্যক্রয়ের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। ২০১২ সালে গ্রামীণ ভারতে একটি পরিবারের মাসিক খাদ্যপণ্য বাবদ ব্যয়ের হার ছিল ৫৩ শতাংশ। সেটা সম্প্রতি কমে গিয়ে হয়েছে ৪৭ শতাংশ। এর অন্যতম কারণ মূল্যবৃদ্ধি, বলছেন বিশেষজ্ঞরা। মোদি জমানায় বিগত ১২ বছরে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি প্যাকেটজাত ও প্রাত্যহিক খাদ্যদ্রব্যের দাম এতই বেড়ে গিয়েছে যে, পেটের ভাতে পর্যন্ত আপস করতে বাধ্য হচ্ছে আম জনতা। উঠে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য। শহরাঞ্চলে মানুষের আয় তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও, সেখানে খাদ্যপণ্য ক্রয়ের হার গ্রামের তুলনায় বেশি কমেছে। গ্রামে গত ১২ বছরে এই হার কমেছে ৬ শতাংশ। শহরে ৭ শতাংশ। শহরাঞ্চলে ২০১২ সালে খাদ্যপণ্য ক্রয়ের গড় হার ছিল ৪৭ শতাংশ। সেটা এখন কমে হয়েছে ৪০ শতাংশ। জিনিসপত্রের দাম কমানোর জন্য মাস সাতেক আগে জিএসটির হার কমিয়েছিল কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের আওতায় থাকা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি দাবি করেছে, জিএসটি হ্রাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে সুরাহা পায়নি দেশবাসী।
কেন আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভুগছেন দেশবাসী? তার সঠিক কারণ কী, তা অবশ্য খু্ঁজে পায়নি এসবিআই। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধপরিস্থিতি বা সামাজিকমাধ্যমে অনিশ্চয়তার আতঙ্ক ছড়ানো, এর কারণ হিসেবে উঠে আসতে পারে বলে মনে করছে দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ব্যাংকটি। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকার যেখানে নগদবিহীন লেনদেনের জন্য গলা ফাটাচ্ছেন বা তাঁদের আমলে ডিজিটাল লেনদেনের সাফল্যের জয়গান গাইছেন, সেখানে স্টেট ব্যাংকের এই রিপোর্ট সেই দাবিকে ফিকে করে দিয়েছে। একটা সময় ছিল, যখন সাধারণ মানুষ কোনো আপৎকালীন প্রয়োজনে নগদ টাকা রেখে দিতেন নিজের কাছে। তখন ব্যাংকিং ব্যবস্থা এত সুষ্ঠু ছিল না। বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। নগদবিহীন লেনদেন এখন হাতের মুঠোয়। ইউপিআই নির্ভরতা বেড়েছে। এরই সঙ্গে মোদি জমানাতেই একবার ৫০০ এবং ১০০০ টাকার পুরনো নোট বাতিল এবং ফের ২০০০ টাকার নোট বাজার থেকে তুলে নেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে বিপদে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তারপরও হাতের নাগালে কাগুজে নোট রাখার প্রবণতা বৃদ্ধি আম জনতার স্বস্তিতে থাকার ইঙ্গিত নয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।