শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: কখনও সিবিআই অফিসার। আবার কখনও মুম্বই পুলিসের ক্রাইম ব্রাঞ্চের শীর্ষ কর্তা। এই পরিচয়ে প্রতারকদের ফোন পেয়েছিলেন সরশুনার বাসিন্দা ব্যবসায়ী এক যুবক। বলা হয় তাঁর পার্সেল এসেছে। তাতে মাদক রয়েছে। সেই সঙ্গে বেআইনি বেশকিছু আর্থিক লেনদেন হয়েছে তাঁর নামে। ব্যবহার হয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত নথি। যেজন্য তাঁকে আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। পুলিসের ফোন পেয়ে ভয় পেয়ে যান ওই যুবক। কাঁপা গলায় বলতে থাকেন, কীভাবে এই ঘটনা ঘটল তিনি বুঝতে পারছেন না। আর নথি কীভাবে বাইরে গেল, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ঘাবড়ে গিয়ে ওই যুবক জানতে চান, এরজন্য কী করতে হবে? ঝামেলা এড়াতে ধারদেনা করে মোট ৭০ লক্ষ টাকা সরশুনার যুবক মিটিয়েছেন প্রতারকদের।
তদন্তকারীরা বলছেন, কী করলে রেহাই মিলবে? যুবকের তরফে এহেন দুর্বলতা প্রকাশ করা মাত্রই তাঁর উপর জাঁকিয়ে বসে জালিয়াতরা। প্রথমে বলা হয়, অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। ভুয়ো সমনের কপি পাঠানো হয় ওই তরুণের মোবাইলে। বলা হয় এরজন্য তাঁকে মুম্বই আদালতে এসে হাজিরা দিতে হবে। তবে তিনি যদি টাকাপয়সা দিতে রাজি থাকেন, তাহলে আসতে হবে না সেখানে। জালিয়াতদের একজন তাঁকে ভিডিও কলে আসতে বলে। তাদের কথামতো ভিডিও কলে হাজির হতেই দেখেন মুম্বই পুলিসের পোশাক পরে একজন বসে রয়েছে। তার পিছনে মুম্বই পুলিসের লোগো রয়েছে। তাঁকে বলা হয় তদন্ত শুরু করেছে মুম্বই পুলিসের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। অভিযোগকারীর কাছে আধার নম্বর জানতে চাওয়া হয়। ভয় পেয়ে তিনি জানিয়ে দেন। প্রতারকরা বলে, তার আধার নম্বরই ব্যবহার হয়েছে। তাই তাঁকে ডিজিটাল অ্যারেস্ট করা হলো। মুক্তির উপায় জানতে চাইলে প্রতারকরা বলে, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পেমেন্ট করলে সমস্ত কেস থেকে খালাস করে দেওয়া হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে সিবিআই অফিসার পরিচয় দিয়ে একজন ফোন করেন ওই ব্যবসায়ীকে। ওই ব্যক্তি জানায় মুম্বই পুলিসের পাশাপাশি সিবিআইও তদন্ত শুরু করেছে। তারাও একই তথ্য পেয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এই অপরাধের জন্য ওই ব্যবসায়ীকে ডিজিটাল অ্যারেস্ট করা হল। তাঁকে বাইরে বেরোতে নিষেধ করা হয়। ভয় পেয়ে টানা তিনদিন ঘরের বাইরে বের হননি ওই যুবক।
এরপর জালিয়াতরা আরও বেশ কয়েকবার সংশ্লিষ্ট যুবককে ফোন করে। এতে ভয় পেয়ে গিয়ে তিনি টাকা দিতে রাজি হন। প্রতারকদের অ্যাকাউন্টে তাদের দাবিমতো টাকা পাঠাতে থাকেন। কিন্তু দাবির পরিমাণ বাড়তে থাকে। খালি হয়ে যায় তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। বিভিন্ন জায়গায় গচ্ছিত অর্থ তুলে টাকা মেটাতে থাকেন। তাতেও নিস্তার পাননি। উল্টে টাকার অঙ্ক বাড়তে থাকায় তিনি চাপে পড়ে যান। তাঁকে বলা হয়, সবমিলিয়ে ৭০ লক্ষ টাকা দিতে হবে। টাকা না মেটালে মুম্বই পুলিসের টিম কলকাতায় গিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করবে। উপায় না দেখে তিনি ব্যাঙ্ক থেকে ৪০ লক্ষের বেশি টাকা ঋণ নিয়ে প্রতারকদের মেটান। তারপরেও টাকা দাবি করায় বিষয়টি নিয়ে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে জানতে পারেন, জালিয়াতদের খপ্পরে পড়েছেন। এরপরই তিনি শুক্রবার সরশুনা থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। সাইবার সেলে অভিযোগ জমা পড়েছে। তদন্তে নেমে অফিসাররা দেখেন, জালিয়াতরা ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) ব্যবহার করে ফোন করেছে। যাতে কোন নম্বর থেকে তারা ফোন করছে, তা চিহ্নিত করা না যায়। সেই কারণে যে ইন্টারনেট পরিষেবা তারা ব্যবহার করেছে, সেখান থেকে তথ্য নিয়ে জানার চেষ্টা হচ্ছে, প্রতারকরা ঠিক কোন কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেছিল।