পরীক্ষিৎ বৃষকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার অঙ্গবর্ণ মৃণালের ন্যায় শুভ্র, কিন্তু ত্রিপাদহীন চরণে কোনপ্রকারে বিচরণ করছ। তুমি কি কোন দেবতা, বৃষের ছদ্মবেশে আমাদের হৃদয়ে বেদনার সৃষ্টি করছ। পরীক্ষিৎ আরো বললেন, হে বৃষ, কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ নৃপতিদের দোর্দণ্ডপ্রতাপের দ্বারা সুরক্ষিত এই পৃথিবীতে তুমি ব্যতীত অপর কোন প্রাণীর চক্ষে শোকাশ্রু নেই। পরীক্ষিৎ আরো বললেন, হে সুরভিনন্দন, তুমি আর শোক করো না। এই নরাধম শূদ্র থেকে তোমার ভয় দূরীভূত হোক। হে মাতা, দুষ্ট ব্যক্তিদের শাসকরূপে আমি যখন বর্তমান, তখন তোমার অমঙ্গলের আশঙ্কা নেই। তুমি শান্ত হও, আর ক্রন্দন করো না।
রাজা বললেন, হে সাধ্বি, যদি কোন রাজার রাজ্যে প্রজাগণ কোন অন্যায়কারী অসৎ ব্যক্তির হস্তে নিগৃহীত হয়, তাহলে সেই রাজার রাজকার্যে অবহেলার অপরাধে আয়ু, যশ, প্রতিপত্তি এমনকি পরকালও বিনষ্ট হয়। উৎপীড়িত প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করাই রাজার সর্বশ্রেষ্ঠ কর্তব্য। যেহেতু অতিপাপিষ্ঠ এই ব্যক্তি প্রাণীদের অকারণে নির্যাতন করেছে, সেইজন্য একে আমি বধ করব। হে সুরভিপুত্র, তোমার চতুষ্পদের তৃতীয়াংশ কে কর্তন করেছে? কৃষ্ণের পদাঙ্ক অনুসরণকারী এই রাজাদের রাজ্যে তোমার ন্যায় দুর্দশাগ্রস্ত তো আর কেউ নেই।
হে বৃষ, তোমার মঙ্গল হোক। তোমার মতো নিরপরাধ ও সৎপ্রকৃতির প্রাণীর দেহ ছেদনের দ্বারা কে বিকৃত করেছে এবং কে পাণ্ডবগণের যশও দূষিত করেছে তার পরিচয় দাও। নির্দোষ ব্যক্তিকে যে অকারণে নিপীড়ন করে, সেই পাপিষ্ঠ নরাধমের নিশ্চয়ই আমার নিকট হতে আশঙ্কার কারণ আছে। দুর্বৃত্ত দমনের দ্বারা অবশ্যই সাধুজনের কল্যাণ হয়ে থাকে। এই রাজ্যে যে দুরাচারী নিরপরাধ প্রাণীকে অকারণে নির্যাতিত করে, দেবতা হলেও, আমি তার অঙ্গদসহ বাহুকে নির্মমভাবে ছেদন করি। পৃথিবীতে স্বাভাবিক কালেও (অর্থাৎ যখন বিপদ থাকে না) যারা বিপথগামী, তাদের ও অন্যান্য অধার্মিক ব্যক্তিদেরও নিজ নিজ বর্ণ ও আশ্রমানুসারে পালন করাই প্রজাশাসক রাজার শ্রেষ্ঠ ধর্ম। ধর্ম, বললেন, হে পাণ্ডববংশীয় রাজা পরীক্ষিৎ, ভীতজনের ভয়াপহারক আপনার এই বাক্য অত্যন্ত সমীচীন। কারণ পাণ্ডবদের গুণসমূহের দ্বারাই আকৃষ্ট হয়ে কৃষ্ণ স্বয়ং তাঁদের পক্ষে দৌত্য প্রভৃতি কর্ম স্বীকার করেছিলেন। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ রাজন্, আমরা বিভিন্ন পণ্ডিতের ভিন ভিন্ন মতবাদে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছি। প্রকৃতপক্ষে, কোথা থেকে, কার দ্বারাই বা জীবগণের দুঃখ সৃষ্টি হচ্ছে, সেই পুরুষের সম্বন্ধে আমরা কিছু জানি না।
অধ্যাপিকা গীতা মাইতি অনুদিত ‘শ্রীমদ্ভাগবতম্’ (১ম স্কন্ধ) থেকে