শ্যামলেন্দু গোস্বামী বারাসত
শ্যামলেন্দু গোস্বামী বারাসত
বাবার কিডনি বিকল। মায়ের দু’বার ব্রেন স্টোক হয়ে গিয়েছে। তাঁরা একপ্রকার শয্যাশায়ী। এই দম্পতির একমাত্র ছেলে শুভজিতের বয়স ১৪ বছর। তার ইচ্ছে ছিল সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার। রেলে চাকরি করার। কিন্তু বাবার অসুস্থতার কারণে কার্যত অচল হতে বসা সংসারের হাল ধরতে হয়েছে ১৪ বছরের কিশোরটিকেই। সে রোজগার করা শুরু করেছে। যা নিয়ে সে স্বপ্ন দেখত ছোটবেলা থেকে সেই রেলকেই বেছে নিয়েছে রোজগারের মাধ্যম হিসেবে। এখন ট্রেনের কামরায় পাঁপড় ফেরি করে শুভজিৎ।
স্কুলের বন্ধুরা যখন ট্রেনে চেপে স্কুলে ক্লাস করতে যায়, তখন শুভজিৎ কামরায় চিৎকার করে ‘ঝুড়ি, কাঠিভাজা, পাঁপড়ভাজা চাই? টাটকা পাঁপড়?’ সকাল থেকে বিকেল হাবড়া থেকে শিয়ালদহ বা রানাঘাট লোকালে হকারি করে। কিশোরটির কর্তব্যবোধ দেখে চমকে যান প্রতিবেশীরা। ট্রেনের কামরায় যে যাত্রীরা তার জীবনের গল্প শোনে তাঁরা বিস্মিত হন।
শুভজিতের বাড়ি হাবড়ার জিয়লগাছিতে। বাবা কৃষ্ণপদ দাম একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন। তাঁদের সংসার মোটামুটি স্বচ্ছলই ছিল। হাবড়ার পূর্বাঞ্চল হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল শুভজিৎ। গতবছর বাবার কিডনি হঠাৎ খারাপ হয়। ততদিনে মায়েরও দু-দু’বার ব্রেনস্ট্রোক হয়ে গিয়েছে। দু’জনেই গুরুতর অসুস্থ। বাবার সঞ্চয় করা টাকা দিয়ে প্রথম কয়েক মাস সংসার চলেছে। কিন্তু চিকিৎসার খরচ, সংসার চালানো, শুভজিতের পড়ার খরচ ওই টাকায় বেশিদিন চলেনি। মা রাজ্য সরকারের দেওয়া লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের এক হাজার টাকা পান। রেশনের চালও পান। তবে তিনজনের জন্য তা আর কতটুকু? তাই এক ট্রেন থেকে অন্য ট্রেন ঘুরতে শুরু করল কিশোরটি। পড়াশোনা করে রেলে চাকরির স্বপ্ন চুরমার। সকাল থেকে সন্ধ্যা খাটাখাটনির পর শ’তিনেক রোজগার হয়। টাকা মাকে দিয়ে দেয়। ছেলের এই উপার্জনই এখন তাঁদের বেঁচে থাকার রসদ। বাবার ডায়ালিসিস চলছে। মায়ের ওষুধ খরচ আছে, সবকিছুরই ভরসা শুভজিতের টাকা। কিশোরটি বলে, ‘সকালে হাবড়া থেকে জিনিস কিনি। ট্রেনে বেচি। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসি। স্টেশনেই খেয়ে নি দুপুরে।’ শুভজিতের মা জয়ন্তীদেবী বলেন, ‘আমরা তো অসহায়। ছেলে বাধ্য হয়ে ট্রেনে হকারি করে।’ চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, ‘এই বয়স খেলার, পড়াশোনার, কিন্তু ছেলেকে হকারি করতে হচ্ছে। একজন মায়ের পক্ষে এটা মেনে নেওয়া যে কত কষ্টের!।তা কেবল আমিই জানি।’ - নিজস্ব চিত্র