সংবাদদাতা, কাকদ্বীপ: গভীর নীল বা লাল আলো দপদপ করে জ্বলছে। সে আলেয়ার নীলচে আভায় সুন্দরবনের মৌসুনি দ্বীপ লহমায় রহস্যময়। ‘এ আলো কোথা থেকে এল?’ ‘এ কি শত্রুদেশের কোনও অস্ত্র!’ ‘নজরদারি চালাতে তারা কি ড্রোন পাঠিয়েছে?’ আত্মরাম খাঁচা গ্রামবাসীদের। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। তা তড়িঘড়ি বন্ধ করা হল। নিভিয়ে দেওয়া হল গোটা গ্রামের আলো। ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ এখন হচ্ছে না। তা সত্ত্বেও বুধবার রাতে মৌসুনি দ্বীপে ব্ল্যাক আউট। বাড়ি ঢুকে দরজায় খিল দিলেন গ্রামবাসীরা। লহমায় গোটা গ্রাম ঘরবন্দি।
সত্যজিতের বঙ্কুবাবুর বন্ধু কল্পবিজ্ঞান গল্পে ক্রোনিয়াম গ্রহের চ্যাং এসে নেমেছিলেন পঞ্চাঘোষের বাঁশবাগানে। সেদিন সে গ্রাম গোলাপি আভায় ভরে গিয়েছিল। বুধবার মৌসুনিতে কি পা রাখলেন চ্যাংয়ের কোনও পাশের গ্রহের বন্ধু? প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত মৌসুনি। কিন্তু উত্তর কিছুতেই মিলছে না। ফলে রাত থেকে ভোর বেড়েই চলল রহস্য। আতঙ্কে সিঁটিয়ে বাচ্চা-বুড়ো-জোয়ান থেকে মহিলা। ভোর হল। বৃহস্পতিবারও আতঙ্কের চর্চা কাটল না। শেষে ভয় কাটাতে আসরে নামল পুলিস। সুন্দরবন পুলিস জেলার সুপার নিজে বললেন, ‘এই বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু সেই আলো যে ড্রোনের, সে ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ওটি বিমানের আলো ছিল।’
মৌসুনি দ্বীপের বাগডাঙা গ্রামে একটি বাৎসরিক পুজো উপলক্ষ্যে বুধবার রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। রাত গড়িয়ে গেলেও আনন্দ করছিলেন সবাই। হঠাৎ আকাশের দিকে একজন তাকাতেই রহস্যময় আলো দেখতে পান। তারপর শুরু হয় আতঙ্ক। ‘হঠাৎ এই দ্বীপের উপরই বা কেন দেখা গেল?’ ‘আগে তো দেখিনি এমন কিছু!’ এসব কথা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে গ্রামজুড়ে। নিমেষে আতঙ্ক গ্রাস করে। শত্রু দেশ কিছু পরিকল্পনা করছে না তো? এই ভেবে তড়িঘড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয় অনুষ্ঠান। সব আলো নিভিয়ে এলাকা পুরো অন্ধকার করে দেওয়া হয়। গুরুপদ জানা নামে এক গ্রামবাসী বলেন, ‘এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আলোগুলি ঘোরাঘুরি করছিল। একটি নয়, এই রকম বেশ কয়েকটি আলো!’
তারপর গৃহবন্দি সবাই। রাত কাটিয়ে দিন হয়। শেষে পুলিস বৃহস্পতিবার রহস্য খোলসা করে। বিশেষজ্ঞরাও জানান, অন্ধকারে বিমান যদি সামান্য নীচ দিয়ে চলাচল করে, তখন তার আলো নীচ থেকে দেখা যায়। দূর থেকে মনে হয় উড়ন্ত কিছু ধেয়ে আসছে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।’ তবে যুদ্ধ আবহে সর্বত্র ড্রোনের হামলা বা নজরদারি চালানোর মতো ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ছে। এই দ্বীপের বাসিন্দারাও মনে করেছিলেন আক্রমণের ঘুঁটি সাজাতেই পাঠানো হয়েছিল ড্রোন। কিংবা ভিনদেশীরা পা রেখেছিলেন। পুলিস রহস্য খোলসা করারও পরও জল্পনার ডানা পাখা মেলেই চলেছে মৌসুনিতে।
বাগডাঙা গ্রামের সেই অনুষ্ঠান।