শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: নিজেকে পুলিশ বলে পরিচয় দিয়ে আলাপ জমানোর পর এক রেলযাত্রীকে মাদক খাইয়ে অচৈতন্য করে সর্বস্ব লুটের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে হাওড়া স্টেশনের ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। জলের বোতল ও কফির মধ্যে মাদক মিশিয়ে ওই যাত্রীকে খেতে দিয়েছিল ওই ব্যক্তি। নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই ঘটনার তদন্তে নেমেছে হাওড়া জিআরপি। ওই যাত্রীকে অচৈতন্য করার হলেও মামলায় কেন খুনের চেষ্টার ধারা যুক্ত করা হয়নি তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রেল পুলিশ সূত্রে খবর, মায়াপুরে গৌরচন্দ্র হালদারের কাঁসা-পিতলের বাসনের কারখানা রয়েছে। কালীপুজো ও ধনতেরাস উপলক্ষ্যে অক্টোবর মাসের শুরু থেকেই তিনি প্রায়ই কলকাতায় আসা-যাওয়া করছিলেন। ১৮ অক্টোবর সকালে তিনি বাসনপত্র নিয়ে নবদ্বীপ থেকে কলকাতায় আসেন। সেদিন বেচাকেনার কাজ শেষ হতে অনেক রাত হয়ে যায়। রাত ১২টা নাগাদ তিনি হাওড়া স্টেশনে এলেও তখন সরাসরি নবদ্বীপ যাওয়ার কোনও ট্রেন ছিল না। ভেবেছিলেন, রাত দেড়টার বর্ধমান লোকাল ধরে ব্যান্ডেল গিয়ে ভোরের দিকে কাটোয়াগামী ট্রেনে উঠবেন। স্টেশনে এসে জানতে পারেন, ওই ট্রেন মেইন লাইনের বদলে কর্ড লাইন ধরে বর্ধমানে যাবে। ফলে বাধ্য হয়েই তিনি হাওড়া স্টেশনে থেকে যান। ঠিক করেন, সকালে মেইন লাইনের প্রথম বর্ধমান লোকাল ধরবেন। শেষমেশ গৌরবাবু ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে বসে পড়েন।
গৌরবাবু পুলিশের কাছে অভিযোগে জানিয়েছেন, কিছুক্ষণ পর তাঁর পাশে এসে বসেন এক মাঝবয়সি ব্যক্তি। তার পরনে ছিল চেক শার্ট ও খাকি রঙের প্যান্ট। পায়ে বুট। গৌরবাবুর ব্যাগের বাইরের অংশে ছাপার অক্ষরে লেখা ছিল নবদ্বীপের একটি দোকানের নাম ও ঠিকানা। ওই ব্যক্তি কথায় কথায় নবদ্বীপে বাড়ি কি না, জানতে চান। তিনি হ্যাঁ বলামাত্র ওই ব্যক্তিও জানান যে, তিনিও নবদ্বীপে থাকেন। ৩২ বছর ধরে পুলিশের চাকরি করছেন। বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিংয়ে থাকাকালীন কী কী কাজ করেছেন, তার ফিরিস্তিও দিতে শুরু করেন। সেই সময়েই ওই ব্যক্তি এক ফাঁকে তাঁর ব্যাগের পাশে রাখা জলের বোতল পাল্টে মাদক মেশানো জলের বোতল রেখে দেন।
সূত্রের খবর, কথা বলতে বলতে গলা শুকিয়ে আসায় এক সময় গৌরবাবু ওই বোতল থেকে জল খেয়ে ফেলেন। তার পরেই তিনি ঘোরের মধ্যে চলে যান। ভোর ৪টে নাগাদ ওই ব্যক্তি তাঁকে কফি এনে দেন। তাতেও সম্ভবত মাদক মেশানো ছিল। ভোর ৪টে ১০ মিনিট নাগাদ তিনি কার্যত টলতে টলতে ট্রেনে ওঠেন। একই কামরায় ওঠেন ওই ব্যক্তিও। এরপর গৌরবাবু অচৈতন্য হয়ে পড়লে সুযোগ বুঝে তাঁর আইফোন, সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ও জিনিস নিয়ে চম্পট দেন ওই ব্যক্তি। বর্ধমানে অন্যান্য যাত্রীরা তাঁকে ডেকে ঘুম থেকে তোলেন। গৌরবাবু দেখেন, তাঁর সর্বস্ব লুট হয়ে গিয়েছে। এর পরেই তড়িঘড়ি বর্ধমান জিআরপিতে যান তিনি। কিন্তু সেখানে থেকে তাঁকে হাওড়া রেল পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ জানাতে বলা হয়। ফিরতি ট্রেন ধরে হাওড়ায় এসে জিআরপিতে এসে ডায়েরি করেন তিনি।
সূত্রের খবর, সিসি ক্যামেরায় অভিযুক্তের ছবি ধরা পড়েছে। এদিকে গৌরবাবুর দাবি, তিনি এফআইআর করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাঁকে বলা হয়, জিডি করেই অভিযুক্তকে ধরা হবে। তাঁর আইনজীবী পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ২৮ অক্টোবর মাদক খাইয়ে চুরির কেস রুজু হয়। পুলিশ পরিচয় দিয়ে অচৈতন্য করার পরেও কেন কড়া ধারা দেওয়া হল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রেল পুলিশের দাবি, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে অভিযুক্তকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। নিজস্ব চিত্র