Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

‘পাঁশকুড়া লোকাল ঢুকছে, সরে যান সরে যান’, ৩৪ বছর আগে ট্রেনে কাটা পড়েন ২৪ জন, লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তায় লক্ষ্মীদা

সকালে রামরাজাতলা স্টেশনের ক্রসিংয়ে প্রচুর মানুষের ভিড়।

‘পাঁশকুড়া লোকাল ঢুকছে, সরে যান সরে যান’, ৩৪ বছর আগে ট্রেনে কাটা পড়েন ২৪ জন, লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তায় লক্ষ্মীদা
  • ২৮ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: সকালে রামরাজাতলা স্টেশনের ক্রসিংয়ে প্রচুর মানুষের ভিড়। একজনের হাতে ডাব কাটার কাটারিটা ধরিয়ে ছুটলেন লক্ষ্মীদা। রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে শুরু করলেন চিৎকার, ‘৪১৭ ফার্স্ট পাঁশকুড়া ঢুকছে। সাবধান। সরে যান, সরে যান।’ চিৎকার শুনে লাইনের পাশ থেকে সরে গেলেন পারাপারকারীরা। ট্রেন এল। চলে গেল। লাইন পেরনোর হুড়োহুড়ি। লক্ষ্মীদাও ছুটলেন। কাটারি নিয়ে শুরু করলেন ডাব কাটা। মানুষটার বয়স প্রায় ষাট। ছেঁড়াফাটা গেঞ্জিটাই সবসময় গায়ে থাকে। বিস্তর পরিশ্রমের পরও মুখের হাসি মিলিয়ে যায় না। 

Advertisement

এলাকার লোকজন বলেন, ‘লক্ষ্ণীদা না থাকলে রামরাজাতলায় শয়ে শয়ে লোক ট্রেনে কাটা পড়ত।’ এ কথা বলার কারণ, প্রতিদিন স্টেশনে বসে ডাব বিক্রি করেন লক্ষ্মী। এটা পেশা। কিন্তু নেশা বা দায়িত্ব হল, লাইন পারাপারকারীদের সাবধান করে দুর্ঘটনা আটকানো। দক্ষিণ-পূর্ব শাখার হাওড়া ও সাঁতরাগাছির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ রেল স্টেশন হল রামরাজাতলা। আপ ও ডাউন লাইনে প্রচুর লোকাল চলাচল করে। যায় মেল, এক্সপ্রেস ট্রেনও। স্টেশনের রেল ক্রসিংয়ে দিনভর লেগে থাকে ভিড়। লাইন পার হতে কেউই ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করেন না। ফলে রোজই দুর্ঘটনার ঝুঁকি। কিন্তু লক্ষ্মীদা থাকেন সর্বদা সজাগ। ফলে শুনতে আশ্চর্য লাগলেও সত্যি, তিনি উপস্থিত থাকাকালীন সচরাচর কোনও দুর্ঘটনা ঘটে না। কোন সময় কোন ট্রেনটি আসছে তা রীতিমতো ঠোঁটস্থ তাঁর। ট্রেন আসার আগে চলে যান লাইনের ধারে। চিৎকার করে সতর্ক করতেই থাকেন। তখন তাঁকে দেখে আস্ত একটি ট্রাফিক সিগল্যালের মতো লাগে। যেন হয়ে ওঠেন লাল-হলুদ-সবুজ রঙের একজন মানুষ।
এই কাজ করতে করতে এমনই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছেন লক্ষ্মী যে, ২০১১ সালে খড়গপুর থেকে ডিআরএম নিজে তাঁকে দেখতে চলে এসেছিলেন। পাঁচ হাজার টাকা ও একটি সার্টিফিকেটও দিয়েছিলেন। স্থানীয়দের অবশ্য বক্তব্য, ‘ওইটুকুই কি শুধু প্রাপ্য লক্ষ্মীর? ওর জন্য দুর্ঘটনা ঘটে না। রক্ষা পায় কত মানুষের প্রাণ। রেলের উচিত, প্রতি মাসে অল্প হলেও অর্থসাহ্যয্য করা।’
উলুবেড়িয়ার বাণীতলায় থাকেন লক্ষ্মীদা। রাত থাকতে ট্রেনে রামরাজাতলা আসেন। ১৯৮৫ সালের আগস্ট থেকে স্টেশনে ডাব বেচচেন। তখন বয়স কম। আবেগ ছিল মনে। ছ’বছর বাদে ১৯৯১ সালের অষ্টমীর দিন একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তখন স্টেশনে ট্রেন আসার সময়সূচি মাইকে ঘোষণা হতো না। রেলগেটে পুলিসও থাকত না। আচমকা একটি গ্যালপিং লোকাল চলে আসে। ট্রেনটির ধাক্কায় এই ক্রসিংয়ে কাটা পড়ে মৃত্যু হয়েছিল ২৪ জনের। সেই ঘটনাটা নাড়িয়ে দিয়েছিল অল্পবয়সি লক্ষ্মীকে। তারপর নিজেই অপরিচিত মানুষের প্রাণ বাঁচানোর দায়িত্ব বেছে নেন। সে কাজে গাফিলতি করেন না কোনওদিন। ফলে প্রাণ যায় না কারও। বলেন, ‘যতদিন বাঁচব এই কাজ করে যাব।’ 
সতর্ক, সাবধানী, অবিচল, অতন্দ্র কর্তব্যবোধের কারণে রামরাজাতলায় আলাদা মর্যাদাই পান লক্ষ্মীদা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ