দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে শান্তিরক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ। সেই আন্তর্জাতিক সংগঠনের পাঁচটি প্রধান স্থায়ী সদস্য দেশ আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। পরমাণু যুদ্ধ হলে তার ফলাফলের বিষয়ে তারা প্রত্যেকেই একমত। ২০২১ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকা, চীন-সহ পাঁচ দেশই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, পরমাণু যুদ্ধে জেতা অসম্ভব। তাই এই যুদ্ধ কখনও করাই উচিত নয়। অর্থাৎ, পরমাণু যুদ্ধ থেকে বিরত থাকাই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিবৃতিতে যাই বলা হোক না কেন, তারপরেও ভারত-পাক সংঘাতের আবহে শুরু থেকেই পরমাণু যুদ্ধের হুঙ্কার ছুড়েছে ইসলামাবাদ। পাক প্রেসিডেন্টের পুত্র তথা পাকিস্তান পিপল্স পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি থেকে উপপ্রধানমন্ত্রী ইশাক দার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ থেকে রেলমন্ত্রী হানিফ আব্বাসি— প্রত্যেকে পারমাণবিক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ১৩০টি পরমাণু বোমা ভারতের দিকে তাক করে রাখা বলে মন্তব্য করেছেন। সেই হুঙ্কারে এখনও বিষাক্ত ভারত সহ গোটা উপ-মহাদেশের বাতাস। স্বাভাবিকভাবেই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রশ্ন তুলেছেন, পাকিস্তানের হাতে পরমাণু অস্ত্র কি আদৌ নিরাপদ! তাঁর দাবি, পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির নজরদারির আওতায় আনা উচিত। আন্তর্জাতিক এই সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পারমাণবিক কার্যকলাপের উপর নজরদারি চালিয়ে থাকে। কিন্তু এই প্রশ্নে রাষ্ট্রসঙ্ঘের পাঁচ প্রধান স্থায়ী সদস্যের নীরবতা গোটা দুনিয়ার বিস্ময় বাড়াচ্ছে!
তাহলে কী ভারত পরমাণু অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানের ‘ব্ল্যাকমেলিং’ দিনের পর দিন সহ্য করে যাবে? ইরানের পরমাণু অস্ত্র নিয়ে যে আমেরিকা এত সরব, তারাই পাকিস্তানের নেতাদের হুঙ্কার নিয়ে এত নীরব কেন? পাকিস্তান এত সাহস পায় কোথা থেকে? ট্রাম্প তো উল্টে বলেছেন, ‘ভারত-পাকিস্তানের একসঙ্গে ডিনার করা উচিত।’ আসলে বিপদ বাড়ছে। পারমাণবিক বিপদ। পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা ও সঙ্কেতের মূল্য অপরিসীম। বস্তুত, ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগ থেকে একটি সত্য কার্যত সর্বজনস্বীকৃত: পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য নয়, কারণ সত্যিই সেই অস্ত্রের আক্রমণ (এবং তার প্রতি-আক্রমণ) ঘটলে আক্ষরিক অর্থেই এই পৃথিবীর সর্বনাশ হবে। অন্য ভাবে বললে, পারমাণবিক যুদ্ধে কারও জয় হতে পারে না, কারণ সকলেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাহলে এই অস্ত্র ধারণ কেন? উত্তর একটিই: নিবারণ। পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই বা ততোধিক দেশের কেউ অপর কাউকেও আক্রমণ করলে পাল্টা আঘাত আসবে— এই বাস্তব সম্ভাবনাই তেমন আক্রমণকে নিবারণ করে। ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতি ও তাতে নিহিত অভয়-সঙ্কেত এই নিবারণী কৌশলকেই স্পষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য রূপ দেয়। পারমাণবিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতির সময় থেকেই ভারত (১৯৯৯) এই নীতি গ্রহণ করেছে। এই অঙ্গীকার বিশ্বের দৃষ্টিতে ‘দায়িত্বশীল’ পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হওয়ার একটি প্রধান শর্তও বটে। পাকিস্তানের নেতাদের পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি সেই দায়িত্বশীল ভাবমূর্তির পক্ষে ক্ষতিকর— এটুকু ইসলামাবাদকে না বুঝিয়ে দিলে আগামী দিনে আমেরিকাকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে!
ফেডারেশন অব অ্যাটোমিক সায়েন্টিস্ট-এর ‘স্ট্যাটাস অব দ্য ওয়ার্ল্ডস নিউক্লিয়ার ফোর্সেস-২০২৫’–এর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন দেশের কাছে আনুমানিক ১২ হাজার ৩৩১টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। যদিও এই সংখ্যা স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর অস্ত্রভাণ্ডারে থাকা পারমাণবিক ওয়ারহেডের তুলনায় (প্রায় ৭০ হাজার) উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম। তবে বর্তমান অস্ত্রগুলি আরও বেশি শক্তিশালী এবং আগামী এক দশকে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আরও বড় করবে বলে আভাস দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস (আইসিএএন)। প্রশ্ন হল, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং দুর্বৃত্ত মানসিকতাসম্পন্ন কোনও দেশের হাতে এই ভয়ঙ্কর পারমাণবিক অস্ত্র থাকাটা কি আদৌ নিরাপদ? উদ্বেগের কারণ, যুদ্ধে পরাজয়ের আশঙ্কা থাকলে পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র আগেই আক্রমণ করে বসতে পারে, বিশেষত সংশ্লিষ্ট দুই রাষ্ট্র যখন যুযুধান প্রতিবেশী। পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র জটিল, সেনাবাহিনী এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব অত্যধিক—এমন একটি রাষ্ট্র যদি প্রতিবেশীর আক্রমণ সম্পর্কে শঙ্কিত থাকে, তবে তার বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া হবে না, এই গ্যারান্টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিতে পারবেন কি? পাকিস্তান পারমাণবিক কূটনীতিকে যেভাবে অস্থির করেছে, তা উদ্বেগজনক বললে কম বলা হয়। এই প্রশ্নে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির কর্তাদের ঘুম থেকে দ্রুত জেগে ওঠা জরুরি।