বালুচিস্তান, পাখতুন প্রদেশ এবং ওয়াজিরিস্তান। এগুলির মধ্যে বালুচিস্তান হল পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। অঞ্চলটি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাখতুন প্রদেশ বা খাইবার পাখতুনখোয়ার সাবেক নাম উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ। ওই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম ধর্মাবলম্বী হলেও তারা একাধিক এথনিক গোষ্ঠীভুক্ত। ওই গোষ্ঠীগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—পশতুন, হিন্দকোয়ান, সরাইকি, চিত্রালি প্রভৃতি। তারা পশতু, পাঞ্জাবি, কালামি, চিত্রালি, কোহিস্তানি, ইদঘা প্রভৃতি ভাষায় কথা বলে। অন্যদিকে ওয়াজিরিস্তান হল পাকিস্তানের একটি কেন্দ্রশাসিত এলাকা। অঞ্চলটি উত্তর এবং দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান নামে দুটি অংশে বিভক্ত। পাঞ্জাবি নেতাদের শোষণের বিরুদ্ধে উপর্যুক্ত তিন অঞ্চলের মানুষ কয়েক দশক যাবৎ সরব। কিন্তু তাদের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ বরদাস্ত করতে রাজি নয়, উগ্র ইসলামি ধারায় জারিত আর্মি কন্ট্রোলড পাকিস্তান। ফলে তাদের উপর দমনপীড়ন অব্যাহত। তার চূড়ান্ত পরিণতি যা হওয়ার সেটাই হচ্ছে এখন। বালুচিস্তান, পাখতুন প্রদেশ এবং ওয়াজিরিস্তানের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ রীতিমতো বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। তারা সরাসরি স্বাধীনতারও দাবি তুলেছে। পাকিস্তানের ‘সর্বশক্তিমান’ সেনা বেপরোয়া দমন-নিপীড়ন চালিয়ে মরুভূমির বালিতে মিশিয়ে দিতে চাইছে বালুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি।
দ্রোহভাবাপন্ন প্রদেশ, তাই জোটে না নাগরিক পরিষেবাগুলিও। রোজ পিষে দেওয়া হয় মানবাধিকার। তাদের উপর পাক সেনার জবরদস্তি যত বাড়ছে তত মারাত্মক হচ্ছে তাদের বিদ্রোহের তীব্রতা। বস্তুত, জঙ্গিবাদে ভরসা রাখার কাণ্ডটা পাকিস্তানের মাতব্বরদের সঙ্গে বোতল থেকে বেরিয়ে পড়া দৈত্যের মতোই অবিশ্বাস্য আচরণ করছে। তারাই এখন পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে উদ্যত। গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকরা পূর্ববঙ্গের জনগণের সঙ্গে মানবেতর আচরণ শুরু করেছিল। ভাষা আন্দোলন দিয়ে জবাব দিতে শুরু করেছিল বাঙালি। কিন্তু তাতেও সতর্ক হয়নি পাক শাসকরা। পরিণামে পূর্ব পাকিস্তানের দখল হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে তাদের চিরতরে। পঙ্গু পাকিস্তানে এই মুহূর্তে যে গৃহযুদ্ধ চাগাড় দিয়ে উঠেছে তাতে একাত্তরে বাঙালির স্বাধীনতার লড়াইয়ের স্মৃতি উসকে দিচ্ছে। পাকিস্তানের লাগাতার নষ্টামিতে আফগানিস্তানের তালিবানের মোহভঙ্গ হয়েছে আগেই। তারই মধ্যে পাকিস্তানের জায়গায় জায়গায় জ্বলছে বিদ্রোহের আগুন। দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ব্যর্থতা ঢাকতে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী বারবারই হিন্দুস্থান তাস খেলে। পাক সরকার ভারতীয় অঙ্গরাজ্য কাশ্মীরে মানবাধিকার নিয়ে ‘বিহ্বল’। কাশ্মীরের পাশে দাঁড়াতেই মহা আয়োজন সীমান্তপারে। কাশ্মীরকে সামনে রেখে হিন্দুস্তানকে জব্দ করার জিগির তুলে অভ্যন্তরীণ অশান্তি ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল নেয় তারা। ভারতের বিরুদ্ধে তস্করসুলভ ছায়াযুদ্ধ জারি রাখে। তারই একটি মহড়ার নাম সাম্প্রতিক পহেলগাঁও টার্গেট কিলিং। পাকিস্তান ভেবেছিল, বেছে বেছে হিন্দুহত্যার পাপ করেও তারা পার পেয়ে যাবে। কিন্তু মঙ্গলবার ভারতীয় সেনা ‘অপারেশন সিন্দুর’ উপহার দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, উন্মাদ পাকিস্তানের ক্ষমা নেই। মঙ্গলবার গভীর রাতে শাহবাজ শরিফ, আসিম মুনিরের ঘরে ঢুকেই একের পর এক জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংস করে দিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনারা। ভারতের এই দুঃসাহসিক অভিযান রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে চীনা প্রতিরোধ সিস্টেম কোনও কাজেই আসেনি।
বস্তুত সারা পৃথিবীর সামনে পাকিস্তানের মুখ পুড়ে গিয়েছে। এখন এমন অবস্থা যে কী দেশপ্রেম, কী উগ্র ইসলামের জিগির—কোনোটাতেই আর কাউকে ভোলাতে পারছে না পাকিস্তান। ওই দেশের জায়গায় জায়গায় ক্ষুব্ধ অপমানিত মানুষ প্রশ্ন তুলছে, আগে বলো ভারত ঢুকল কীভাবে? তাহলে তোমাদের দম কোথায়? এমনকী কিছু লোক বলছে, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে আমরা এই পাকিস্তানের পক্ষ নেব না। কেননা, এই যুদ্ধের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনও সম্পর্ক নেই—এটি বস্তুত হিন্দুস্তান বনাম পাঞ্জাব। সব মিলিয়ে দেশটা অখণ্ড রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পাকিস্তানের কাছে। কেননা পাকিস্তান সেই অর্থে আর কোনও রাষ্ট্র নয়। কিছু অস্ত্র ব্যবসায়ী আর ধান্দাবাজ পলিটিশিয়ানের একটা তালুক মাত্র। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই পাঞ্জাব প্রদেশের লোক। মূলত তারাই গোটা পাকিস্তানকে দাবিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু বাকিরা তো তা মানবে না। এই দ্বন্দ্ব থেকেই পাকিস্তান জুড়ে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পাক সেনাও কি ঐক্যবদ্ধ? মনে হয় না। বড় প্রমাণ, গোলমেলে প্রদেশগুলির প্রতি প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি রয়েছে পাকিস্তানেরই সেনাবাহিনীর অনেক জওয়ান এমনকী কিছু কর্তারও। সর্বার্থেই ঐক্যবদ্ধ, পৃথিবীর অন্যতম সেরা সামরিক ও আর্থিক শক্তি ভারতকে জব্দ করার খোয়াব দেখার আগে পাকিস্তানের উচিত, তাদের ঘর সামলানো। তাদের প্রাসাদ যেকোনও দিন পাকিস্তানের লোকজনই তাসের ঘরের মতোই ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে পারে। ভাঙা দেওয়ালগুলি ঝড়ের মুখে উড়ে বেরিয়ে যেতে পারে তাসের মতোই।